ইন্দ্রনীল সেন গায়ক হিসেবে খারাপ ছিলেন, এ কথা তাঁর ঘোরতর বিরোধীও বলবেন না। বরং এই বাংলায় একটা সময় ছিল, যখন ক্যাসেটের দোকানে নতুন ক্যাসেট এলেই খোঁজ পড়ত – ইন্দ্রনীলের নতুন কী গান বেরোলো?
অথচ এই পথচলার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল একেবারে কৈশোরে, সুর জগতের একটি অসম্ভব প্রতিভাবান শিশুশিল্পী হিসেবে পথ চলা শুরু হয়েছিল নিজের পায়ে- নিজের চেষ্টায়- নিজের মতো করে। মাত্র পনেরো বছর বয়স। যে বয়সে ছেলেরা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে মাঠে দৌড়ায়, সেই বয়সে তিনি বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুললেন একটি গানের দল – ‘নগর ফিলোমেল’। সঙ্গে ছিলেন গৌতম নাগ, ইন্দ্রজিৎ সেন, পৃথা সেনের মতো ব্যক্তিত্ব। সেই ছোট্ট ঘরের রিহার্সেলে এসে হারমোনিয়াম ধরতেন, গলা মেলাতেন রিমলি সেনগুপ্ত, ইন্দ্রাণী সেন, প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তখনকার উঠতি সম্ভাবনাময় শিল্পীরা।
“বিজনের চায়ের কেবিনে, আড্ডা জমে উঠেছিল বেশ…”
সেই আড্ডা থেকেই জন্ম নিল কিছু গান, যা পরে কালজয়ী হয়ে গেল। কণ্ঠে কণ্ঠে উন্মুক্ত হয়ে উঠেছিল ‘নীল পাখির পাঠশালায়’!
“একদিন সুতানুটি ছেড়ে ডানা মেলে উড়ে চলি, তারাভরা আকাশের নীচে…”
আজও যখন এই গান বাজে, তখন শ্রোতা হয়তো জানেনও না, এর পিছনে থাকা এক কিশোরের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। সেই বয়সেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সুর যে তাঁর রক্তে।
তারপর প্রথম অধ্যায় শেষ হলো। এলো দ্বিতীয় অধ্যায়। যাকে বলা যায় রিমেকের যুগ।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি। বাংলা আধুনিক গান তখন এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগছে। পুরনো কিংবদন্তীরা প্রায় অন্তরালে, নতুন গান সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। ঠিক তখনই বাজারে এলো ‘দূরের বলাকা’। কভারে এক উদাস যুবক – ইন্দ্রনীল সেন। ভিতরে অখিলবন্ধু ঘোষের _“ওই যে আকাশের গায়ে…”, মৃণাল চক্রবর্তীর–
“জড়োয়ার ঝুমকো থেকে…”, শচীন দেব বর্মনের “বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে…”, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের “এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার…” — সব একে একে নতুন যন্ত্রানুষঙ্গে, নতুন কণ্ঠে।
“আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন, আজ ওই চোখে সাগরের নীল…”
কণ্ঠে ছিল মাদকতা, ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। তরুণ প্রজন্ম, যারা আসল রেকর্ড শোনেনি, তারা এই নতুন ভার্সনকেই আপন করে নিয়েছিল সেদিন।
কিন্তু এখানেই বিতর্কের শুরু। ক্যাসেটের ইনলে কার্ডে গীতিকার ও সুরকারের নাম ছাপা থাকলেও, যাঁরা এই গানগুলোকে প্রথমবার রেকর্ড করেছিলেন, যে কোম্পানি এই ‘বেসিক রেকর্ড’-এর আইনি অধিকারী, তাঁদের নাম, তাঁদের ঐতিহাসিক অবদানের কোনো উচ্চারণ থাকল না। শ্রোতার মনে হলো, গানটা বুঝি ইন্দ্রনীলেরই। এইখানেই তিনি, অনেক সমালোচকের মতে, এক নতুন ‘ফর্মুলা’র জন্ম দিলেন। পুরনো সোনাকে নতুন করে পালিশ করে বিক্রি করা, অথচ খনি শ্রমিকের নাম ভুলে যাওয়া। পরবর্তীকালে বাংলায় রিমেকের যে বন্যা এলো, তার প্রথম সফল পরীক্ষাগার ছিল কিন্তু এই ‘দূরের বলাকা’।
এই পর্বেই এলো আরও কিছু মৌলিক গান, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠল বিস্তর। যেমন ‘চৈতালি চাঁদনী আলো’। অনেক সঙ্গীতবোদ্ধা কান পাতলেই শুনতে পেতেন, এর সুরের আদলটি কিশোর কুমারের শেষ জীবনের একটি অপ্রকাশিত এলবামের গান — “সেই রাতে রাত ছিল ”-র সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
_“চৈতালি চাঁদনী আলো, কে যেন ডাকে আয় আয় বলে…”
গানটি জনপ্রিয় হলো, কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে গেল – অনুপ্রেরণা, নাকি অনুকরণ?
এই বিতর্ক চলতে চলতেই জীবনের মোড় ঘুরে গেল তৃতীয়বার। এলো এবার ‘অনুপ্রেরণা’র নতুন রূপ — নতুন ঘরানা, শুধুই ‘অনুপ্রেরণা’!
তৃতীয় ইনিংস। ক্ষমতার ইনিংস।
শিল্পী ইন্দ্রনীল থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ইন্দ্র। বাংলা গানের জগতে তাঁর প্রভাব তখন এমন জায়গায় পৌঁছল যে, শোনা যেত, তাঁর একটি ফোন ছাড়া বড় মিউজিক কোম্পানিগুলোও কোনো নতুন প্রজেক্টে হাত দিতে সাহস পেত না। এইচএমভি হোক বা সাগরিকা – সবার কাছেই তিনি তখন অঘোষিত ‘মিউজিক সুপার’, তিনিই অলিখিত ‘প্রডিউসারদের প্রডিউসার ‘!
আর তারপর রাজনীতি। সংস্কৃতি ও পর্যটন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী, চন্দননগরের বিধায়ক। প্রশাসনিক সভায়, মঞ্চে হার হাইনেসের পাশে তাঁর উপস্থিতি, তাঁর গান —
_“যদি তারে নাই চিনি গো, সে কি আমায় নেবে চিনে…”
এই ডুয়েট যেন বাংলার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে এলো ক্ষমতার অন্ধকার দিক নিয়ে অভিযোগও। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় তাঁর নিজের কেন্দ্রে ভোটের দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের উপর ক্রমাগত চাপ, হুমকির অভিযোগ শুনেছিলেন অনেকেই। সেই সময়ের অনেক কর্মী আজও নীরবে সেই দিনগুলোর কথা বলেন। সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন, কিন্তু অভিযোগটি বাতাসে ভেসেছিল।
আর তারপর এলো চূড়ান্ত পতনের দিন।
যে দুর্গাপুজোকে তিনি ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা পাওয়ার কারিগর হিসেবে নিজের কৃতিত্বের মুকুটে পালক হিসেবে পরতেন, সেই দুর্গাপুজোই তাঁর কাল হলো।
গত ২৮ অক্টোবর, ২০২৬। সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। অভিযোগ, তাঁর স্ত্রীর নেতৃত্বাধীন MassArt নামক একটি সংস্থা ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছে ১৮০০ থেকে ১২০০০ টাকা দামের প্রিভিউ পাস বিক্রি করেছে, যদিও ইউনেস্কোর সঙ্গে তাদের কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না। ২০২২ সালে ১৯ হাজার, ২০২৩ সালে ৩৪ হাজার, ২০২৪ সালে ৬১ হাজার মানুষ এই পাস কিনেছিলেন বলে ইডির প্রাথমিক অনুমান। মোট অঙ্কটা ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা।
“পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো…”
যে মায়ের কোলের গান গেয়ে তিনি মানুষের হৃদয় জিতেছিলেন, আজ সেই বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবকে ঘিরে প্রতারণার অভিযোগে তাঁকে চার ঘণ্টা জেরার পর গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সিজিও কমপ্লেক্স থেকে সোজা লালবাজার। পরের দিন ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তাঁকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হলো।
এই ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন? নাকি এক বৃহত্তর ছবির অংশ? কান টানলে মাথা আসে, কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোয় – বাংলার এই প্রবাদগুলো আজ আবার প্রাসঙ্গিক। এই তদন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না। আইন তার নিজের পথে চলবে।
কিন্তু শিল্পী হিসেবে তাঁর বিচার কী হবে?
বাঙালি বড় আবেগপ্রবণ জাতি। সে গান মনে রাখে, কিন্তু গায়কের অপরাধ ভোলে না। আজ যখন রেডিওতে বাজে —
“আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা…”
তখন শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যার ‘সুর’-এ মানুষ মোহিত হতেন; তিনিই আজ ‘অসুর’ ! সুরের প্রতি ভালোবাসা, আর মানুষটির প্রতি মোহভঙ্গ – এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকাই এখন বাঙালির নিয়তি।
দূরের বলাকা আজ খাঁচায় বন্দি। ডানা মেলে উড়ে চলা সুতানুটির সেই কিশোর আজ তারাভরা আকাশের নীচে নয়, লালবাজারের লকআপের ছাদের নীচে। এই উত্থান-পতনের কাহিনি হয়তো একদিন সিনেমা হবে, গান হবে। কিন্তু আপাতত, জনতার দরবারে বিচার চলছে, নীরবে, অবিরাম।
অনেকেই খিল্লি করে বলছেন… ” এক ক্ষমতাবানকে ‘সুরশিল্লী’ বানাতে গিয়ে তাঁরই অনুপ্রেরণায় ইন্দ্রনীল কখন যে হয়ে গেলেন ‘অসুর’ তা তিনি হয়তো টেরও পাননি।