একদিনেই চারদিনের পুজো, সাবেকিয়ানায় মোড়া পূর্ব বর্ধমানের দুই বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব
কেতুগ্রাম ও মঙ্গলকোট থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি, Muthokotha.in : শহরের থিমের চমক আর আলোর রোশনাইয়ের ভিড়ে যখন গোটা বাংলা মেতে উঠেছে আধুনিক দুর্গাপুজোয়, তখনও পূর্ব বর্ধমানের আনাচে-কানাচে নিঃশব্দে বেঁচে আছে ইতিহাস, পরম্পরা আর সম্প্রীতির গল্প। এমনই দুই ব্যতিক্রমী বনেদি বাড়ির পুজো হল কেতুগ্রামের পাঁচঘড়া মন্দিরের দাশগুপ্ত বাড়ির পুজো এবং মঙ্গলকোটের গণপুরের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো। একটি পুজোয় চারদিনের আচার মেটে একদিনেই, অন্যটি আজও টিকে আছে তালপাতার পুঁথি আর হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে।
কেতুগ্রামের পাঁচঘড়া মন্দির: যেখানে নবমীতেই সপ্তমী থেকে দশমী
পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ব্লকের পাঁচঘড়া গ্রামের এই মন্দিরটি বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরের ইতিহাস প্রায় কয়েকশো বছরের পুরনো। স্থানীয়রা একে পাঁচঘড়া মন্দির নামে চেনেন, কিন্তু আদতে এটি দাশগুপ্ত পরিবারের পারিবারিক দুর্গাপুজো।
পরিবারের বর্তমান সদস্য তপন দাশগুপ্ত জানান, এই পুজোর সূচনা করেছিলেন তৎকালীন জমিদার বিক্রম চৌধুরী। তিনি ছিলেন ঘোর শাক্ত। নিয়মিত দেবী দুর্গার সাধনা করতেন। জনশ্রুতি আছে, একবার নবমীর দিন গভীর সাধনায় মগ্ন ছিলেন তিনি। হঠাৎ মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজার চৌকাঠে আগে থেকে ছড়িয়ে রাখা সিঁদুরের ওপর একটি ছোট্ট পায়ের ছাপ দেখতে পান। পরিবারের বিশ্বাস, স্বয়ং দেবী এসেছিলেন। সেই অলৌকিক ঘটনার পরেই তিনি ওই নবমীর দিনেই দুর্গাপুজো শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
তখন থেকেই রীতি চলে আসছে, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী – এই চারদিনের পুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান, ভোগ, আরতি, হোম-যজ্ঞ সবকিছুই নবমীর একদিনের মধ্যেই শেষ করা হয়। সময়ের অভাবে নয়, এটি ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক।
এই পুজোর আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ৬৪ যোগিনীর পুজো। নবমীর দিন দেবীর মূল পুজোর পাশাপাশি ৬৪ জন যোগিনীর উদ্দেশ্যে আলাদা করে কলাপাতার ওপর নৈবেদ্য সাজানো হয়। আতপ চাল, ফল, মিষ্টি ও সিঁদুর দিয়ে সেই নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। এলাকার মানুষের বিশ্বাস, এই ৬৪ যোগিনীই গ্রামকে সমস্ত অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করেন।
আর সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম, এই প্রতিমার কখনও বিসর্জন হয় না। মন্দিরের মধ্যেই সারা বছর ধরে ওই প্রতিমারই নিত্যপুজো হয়। শুধু পুজোর সময় নতুন করে সাজানো হয়, অঙ্গরাগ হয়। ফলে দেবী এখানে উমা রূপে বাপের বাড়ি আসেন না, তিনি এখানে সর্বদাই বিরাজমান।
মঙ্গলকোটের গণপুর: নামের পেছনেও ইতিহাস, পুঁথির মন্ত্রে আজও পুজো
অন্যদিকে মঙ্গলকোট ব্লকের গণপুর গ্রামের ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো। এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামের নামকরণের ইতিহাসও।
জানা যায়, এই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন রঘুনাথ ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন এক বিখ্যাত জ্যোতিষী। তাঁর গণনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা বর্ধমান জুড়ে। গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘গণকঠাকুর’ বলে ডাকতেন। সেই গণকঠাকুর শব্দটি অপভ্রংশ হয়েই গ্রামের নাম হয় গণপুর। সেই রঘুনাথ ভট্টাচার্যের বাড়িতেই আজও দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।
এই পুজোর সূচনা করেছিলেন সাধক বামাচরণ ন্যায়রত্ন। প্রায় ৪৫০ বছর আগে তিনি বাঁশ ও তালপাতা দিয়ে একটি আটচালা তৈরি করে দেবীর আরাধনা শুরু করেন। তখন ইট-কাঠের মন্দির ছিল না, ছিল মাটির ঘর আর বিশ্বাস।
বাড়ির প্রবীণ সদস্য রামজীবন ভট্টাচার্য জানান, এই পুজো আজও পুরনো তালপাতার পুঁথি ধরেই হয়। অষ্টাদশ শতকে যখন কাগজের প্রচলন তেমন ছিল না, তখন কালি ও আতপ চাল বেটে এক বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করে তালপাতার ওপর মন্ত্র লেখা হতো। সেই পুঁথি দেখেই আজও পুরোহিত মন্ত্রপাঠ করেন। ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাড়ির বেশিরভাগ পুঁথি নষ্ট হয়ে গেলেও, কয়েকটি পুঁথি এখনও অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত আছে। সেই পুঁথিই এই পরিবারের সম্পদ।
এই পুজোর আরেকটি বড় দিক হল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। পরিবারের দাবি, বহু বছর আগে যখন আটচালা তৈরির জন্য অর্থ বা লোকবলের অভাব ছিল, তখন পাশের গ্রাম বকুলিয়া ও ইন্দ্রসনার কয়েকটি মুসলিম পরিবার নিজেদের খরচে তালপাতা দিয়ে সেই আটচালা ছেয়ে দিয়ে যেতেন। তাঁরাই বাঁশ কেটে, ছাউনি বেঁধে দিতেন। বিনিময়ে কিছুই নিতেন না। নবমীর দিন ভট্টাচার্য বাড়ি থেকে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে পান-সুপুরি, রুটি ও মিষ্টি বিতরণ করা হতো। সেই রীতি আজও প্রতীকীভাবে মানা হয়। আর এই প্রতীক এলাকার প্রতিটি মানুষের মধ্যে সত্যের উজ্জ্বল রূপ।
এছাড়াও এখানে নবমীর দিন মাতৃপুজোর সঙ্গে গ্রহরাজেরও পুজো হয়। কথিত আছে, স্বয়ং গ্রহরাজ স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন যে, দেবীর সঙ্গে তাঁরও পুজো করতে হবে। সেই থেকে এখানে গ্রহশান্তির জন্য বিশেষ পুজো হয়। সেই পুজোই বহমান ধারাস্রোত এখনো অমলিন।
একসময় বর্ধমান রাজবাড়ি থেকেও এই পুজোর জন্য অর্থ সাহায্য আসত। ভট্টাচার্য বাড়ির ঢোলের শব্দ শুনে আশপাশের অন্যান্য পুজোর অষ্টমীর বলি হতো, এমনই ছিল এর প্রভাব।
আজ থিমের যুগে এই দুই পুজোই মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মিলনের এক জীবন্ত দলিল। এই দলিলের পাতায় পাতায় আকর্ষণীয় ইতিহাস । ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হোক চাইছেন এলাকার মানুষজন।