তিন গ্রামের খুঁটি পুজোয় শারদীয়ার আগমনী সুর, গ্রামবাংলার ঐক্যের অনন্য নজির
পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর: শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর শিউলির গন্ধ জানান দিচ্ছে মা আসছেন। শহরের পুজোর চাকচিক্যের বাইরে, গ্রামবাংলার শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে তিনটি গ্রামের মানুষের মিলিত উদ্যোগে বেজে উঠল আগমনীর সুর। মঙ্গলবার গণেশ চতুর্থীর পুণ্য লগ্নে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর-২ ব্লকের অন্তর্গত পূর্ব খাড়, দক্ষিণ খাড় এবং বৈঁচা গ্রামের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল সার্বজনীন দুর্গোৎসবের খুঁটি পুজো।
এটা শুধু একটি পুজোর খুঁটি স্থাপন নয়, এটা তিনটি গ্রামের হৃদয়ের বন্ধন, ঐক্যের প্রতীক। গত বছর প্রথমবার এই তিন গ্রামের মানুষজন সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হয়ে শুরু করেছিলেন এই দুর্গোৎসব। সেবার অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছিল। গ্রামের মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে শহরের ঝাঁ চকচকে থিমের পুজোর ভিড়েও গ্রামের আন্তরিকতায় ভরা পুজো নিজের জায়গা করে নিতে পারে। সেই সাফল্যে ভর করেই এবার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করল ‘দক্ষিণ খাড়, পূর্ব খাড়, বৈঁচা সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি’র পুজো।
মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ খাড় বাজারের পাশে পূর্ব নির্ধারিত পুজো মণ্ডপ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় খুঁটি পুজোর। পুরোহিতের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাকের গুরুগম্ভীর বোল, মহিলাদের সমবেত শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আম্রপল্লব, সিঁদুর, ঘট ও ফুল দিয়ে সুসজ্জিত হয়ে খুঁটি স্থাপন করা হয়। প্রথা মেনে খুঁটিকে পুজো করে মায়ের আগমনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হল।
এদিনের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় ছিল মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। গ্রামের বধূ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের ছাত্রী, প্রাক্তন শিক্ষিকা থেকে গৃহবধূ – সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুজোর কাজে হাত লাগিয়েছেন। শুধু শঙ্খ বাজানো নয়, মণ্ডপ পরিষ্কার থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, সবকিছুতেই তাঁদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এ যেন নারীশক্তিরই আরাধনার প্রস্তুতি।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। ছোট ছোট শিশুদের মুখে হাসি, বড়দের চোখে আগামী দিনের স্বপ্ন – সব মিলিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্ত।
পুজো কমিটির সদস্যরা জানান, তাঁরা থিমের দৌড়ে না গিয়ে সাবেকি প্রতিমা ও সনাতনী ঐতিহ্যকেই প্রাধান্য দিতে চান। তবে আলোকসজ্জায় থাকবে বিশেষ চমক। কলকাতা থেকে আসা নামী শিল্পীদের আলোয় ঝলমল করে উঠবে গোটা এলাকা। পাশাপাশি তিন গ্রামের স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে তিনদিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে থাকবে লোকগীতি, নৃত্য, নাটক ও আবৃত্তি। উদ্দেশ্য একটাই – গ্রামের প্রতিভাকে মঞ্চ দেওয়া এবং শিশুদের মধ্যে সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনা জাগিয়ে তোলা।
কমিটির কার্যকরী সম্পাদক চন্দন পাত্র আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমাদের পুজোয় মা-বোনেদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ এবং সমস্ত কাজে হাত লাগানো আমাদের পুজোকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে। এটা শুধু আমাদের পুজো নয়, এটা আমাদের তিন গ্রামের মায়ের পুজো। আমরা চাই এই পুজোকে কেন্দ্র করে এলাকার শিশুদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা প্রসারিত হোক। শহরের অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থেকে তারা যেন বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে চেনে। এবারের পুজোর বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা, যা গ্রামের মানুষের চাঁদা ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় সংগৃহীত হয়েছে।”
মহিলাদের পক্ষ থেকে প্রাক্তন শিক্ষিকা মালতী আচার্য্য বলেন, “শহরের চাঞ্চল্যতা থেকে দূরে গ্রামের শান্ত পরিবেশে বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে আমরা মহিলারা একত্রিত হয়েছি। শুধু আনন্দ নয়, এর সাথে সাথে একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক বাতাবরণ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা প্রমাণ করতে চাই, গ্রামের মহিলারাও পারে।”
এদিনের খুঁটি পুজো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সম্পাদক আইনজীবী দিলীপ আচার্য্য, প্রাক্তন শিক্ষক বিশ্বনাথ আচার্য্য, কোষাধ্যক্ষ তারকান্ত মিশ্র, সভাপতি চন্দন জানা, হরিশ্চন্দ্র আচার্য্য, নরনারায়ণ দাস , প্রদীপ আচার্য্য সহ তিন গ্রামের বিশিষ্টজনেরা।
এই খুঁটি পুজো শুধু বাঁশের খুঁটি পোঁতা নয়, এটা বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন। এই পুজো প্রমাণ করে, আজও গ্রামবাংলা বেঁচে আছে তার পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও ঐক্যের মধ্যে। তিন গ্রামের এই মিলিত প্রয়াস নিঃসন্দেহে জেলার অন্যান্য পুজো উদ্যোক্তাদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। মায়ের আগমনের অপেক্ষায় এখন দিন গুনছে পূর্ব খাড়, দক্ষিণ খাড় ও বৈঁচা।