চার দশকের আত্মগোপনের অবসান: পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর থেকে ধৃত মাওবাদী শীর্ষ নেতা আকাশ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজ্য পুলিশের হাতে বড় সাফল্য। অবশেষে জালে পড়লেন জঙ্গলমহলের ত্রাস, নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী) সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ ওরফে মনোজ। বুধবার গভীর রাতে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে এই গ্রেফতারের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য জুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতেই তিনি গোপন ডেরা ছেড়ে জনবহুল এলাকায় এসেছিলেন। সেই গোপন খবরের ভিত্তিতেই ফাঁদ পাতে এসটিএফ। দীর্ঘদিন ধরে যিনি ঘন জঙ্গল, পাহাড় এবং দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে নিজের আশ্রয় বানিয়ে রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত লোকালয়ের কাছেই ধরা পড়ে গেলেন।
এই গ্রেফতারি আচমকা নয়, এর পিছনে রয়েছে টানা কয়েক সপ্তাহের নজরদারি। মাত্র তিন দিন আগেও, অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর, আকাশকে ধরতে বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী রোলাহাটু পাহাড় এবং তার সংলগ্ন গভীর জঙ্গলে যৌথবাহিনী বিশাল চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালায়। দু’দিন ধরে চলা সেই অভিযানে আকাশের নাগাল না মিললেও, একটি গোপন আস্তানা থেকে দু’টি ইনসাস রাইফেল, ১০৩ রাউন্ড কার্তুজ এবং ছ’টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। তখনই গোয়েন্দাদের অনুমান ছিল, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর জঙ্গলে বেশিদিন টিকতে পারবেন না।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত নিরাপত্তাবাহিনীর চাপ এবং নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে আকাশ তাঁর সশস্ত্র স্কোয়াড বা সামরিক দস্তা ভেঙে দিয়েছিলেন। একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছিল, তাঁর মাথার দাম এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা এবং টাকা জোগাড় করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, আর সেটাই তাঁর জন্য কাল হলো। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর ১ ব্লকের নৈপুর গ্রামপঞ্চায়েতের মনিনাথপুর এলাকায় পরিচিত কোনও পুরনো যোগাযোগের সূত্র ধরেই তিনি এসেছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে।
আকাশের মাওবাদী জীবনের ইতিহাস প্রায় চার দশকের। ১৯৮০-র দশকে কলেজে পড়াকালীনই তিনি তৎকালীন নকশাল আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধীরে ধীরে তিনি চরম বামপন্থী রাজনীতির গভীরে প্রবেশ করেন। পরবর্তীকালে সিপিআই (মাওবাদী) গঠিত হলে তিনি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হয়ে ওঠেন।
পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী আন্দোলনে তাঁর উত্থান মূলত কিষানজি ওরফে কোটেশ্বর রাওয়ের মৃত্যুর পর। ২০১১ সালে কিষানজির এনকাউন্টারের পর রাজ্যে সংগঠনের হাল ধরেন আকাশ। গত ১৪ বছর ধরে তিনিই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী সংগঠনের কার্যত সর্বোচ্চ নেতা। জঙ্গলমহলের লালগড়, শালবনি, বেলপাহাড়ি, ঝাড়খণ্ড সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা। দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে, জঙ্গলের ভিতর থেকেই তিনি সংগঠন পরিচালনা, নতুন সদস্য নিয়োগ এবং অর্থ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা মহলের মতে, এই গ্রেফতারি নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী কার্যকলাপের উপর একটি বড় আঘাত।
প্রথমত, আকাশ ধরা পড়ায় রাজ্যে মাওবাদী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। গত দু’বছরে একাধিক মাওবাদী সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে বা গ্রেফতার হয়েছে। আকাশের গ্রেফতার সেই তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম।
দ্বিতীয়ত, তদন্তকারীরা মনে করছেন, আকাশকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। বিশেষ করে –
১. সংগঠনের এখনও টিকে থাকা স্লিপার সেল এবং শহুরে নেটওয়ার্ক কারা?
২. অস্ত্র ও গোলাবারুদ কোথা থেকে আসতো এবং অর্থের উৎস কী ছিল?
৩. ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় এবং ওড়িশার মাওবাদী নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম কী?
৪. গত কয়েক মাসে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তার সঙ্গে কোন কোন পুরনো নাশকতার যোগ রয়েছে?
এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, আকাশকে কলকাতায় নিয়ে এসে তাঁকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।
একটা সময় ছিল যখন পুরো জঙ্গলমহল মাওবাদীদের দখলে ছিল। দিনের পর দিন অপহরণ, খুন, পুলিশ ক্যাম্পে হামলা লেগেই থাকত। গত এক দশকে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ এবং যৌথবাহিনীর লাগাতার অভিযানে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। জঙ্গলমহলে এখন রাস্তা হয়েছে, স্কুল, হাসপাতাল হয়েছে। বহু মাওবাদী মূল স্রোতে ফিরে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে চার দশকের প্রবীণতম নেতার গ্রেফতার সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও মজবুত করবে বলেই মনে করছে প্রশাসন। তবে গোয়েন্দাদের একাংশ এখনও সতর্ক। তাঁদের মতে, শীর্ষ নেতা ধরা পড়লেও, সংগঠনের নিচুতলার নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। আকাশের গ্রেফতারির পর তারা আরও মরিয়া হয়ে কোনও নাশকতার চেষ্টা করে কিনা, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
আপাতত কলকাতা পুলিশের এসটিএফ-এর এই সাফল্যকে রাজ্য পুলিশের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যে ‘ছায়া-মানব’কে ধরতে নিরাপত্তা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ছায়াই ধরা দিল লোকালয়ে।