_রেল সংলগ্ন এলাকায় চলমান হকার উচ্ছেদ অভিযানে কলকাতা হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশে সাময়িক স্বস্তি পেলেন হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। জীবিকা ও বাঁচার মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে দায়ের হওয়া একাধিক জনস্বার্থ মামলার শুনানির পর বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়।
.কোন কোন এলাকায় স্থগিতাদেশ:
__আদালত জানিয়েছে, বালিগঞ্জ, বামনগাছি, বারুইপুর, ডানকুনি, গুমা, বনগাঁ, দুর্গনগর, মথুরাপুর ও যাদবপুর-সহ যেসব স্টেশন ও রেল ভূখণ্ডের উচ্ছেদ নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়েছে, সেখানে পরবর্তী শুনানির আগে পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ অভিযান চলবে না। ফলে ওই অঞ্চলগুলোতে বুলডোজার আপাতত থমকে গেল।
.আবেদনকারীদের যুক্তি:
__মামলাকারীদের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে সওয়াল করেন, “সংবিধানের ১৯(১)(জ) ধারা অনুযায়ী পেশা ও বাণিজ্যের অধিকার এবং ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী জীবনের অধিকার মৌলিক অধিকার। দশকের পর দশক ধরে ব্যবসা করে যাঁরা সংসার চালাচ্ছেন, তাঁদের হঠাৎ তুলে দিলে সেই অধিকার সরাসরি লঙ্ঘিত হয়।” __তিনি বলেন, “কেন্দ্র বা রাজ্য কারওই নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের এখতিয়ার নেই। পিছিয়ে পড়া শ্রেণির কাজের অধিকার কোনো অজুহাতে খর্ব করা চলে না। ঠেলাগাড়ি, ঝুপড়ি দোকান করে হাজার হাজার পরিবার বাঁচে। সরকারের দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো, উল্টে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা নয়।”__বিকাশবাবু সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “কেউ রেলের জমিতে বসলে শুরুতে বাধা না দিলে ২০-৩০ বছর পর তাকে সরানো যায় না। রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতিপক্ষ হতে পারে না। অথচ আচমকা বুলডোজার দিয়ে সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ রাত জেগে পাহারা দিয়েও রক্ষা পাচ্ছে না।”
.লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও নোটিশ:
__আইনজীবী ফিরদৌস শামিম অভিযোগ করেন, “যাত্রীদের অভিযোগের জেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরানো হচ্ছে। বারুইপুরে ১৯৯৫ সাল থেকে লাইসেন্সধারী ৪০টি পরিবারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ডানকুনিতে ৩২টি পরিবার নোটিশ পেয়েছে, যাতে তারিখ-স্বাক্ষর কিছুই নেই। বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও কেন নোটিশ, তার জবাব নেই।”
.রেলের পাল্টা বক্তব্য:
__রেলের আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী আদালতে বলেন, “১৮৮১ সালে ওই জমি অধিগ্রহণের সময় ন্যূনতম মূল্য জমা দিতে বলা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি। রেলের জমি বেআইনিভাবে দখল করে ব্যবসা চলছে। যাত্রী পরিষেবা ও নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্ছেদ জরুরি।”
.আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ:
__শুনানিতে বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, “রেলের জমি দখল করে দোকান বসলে রেল সরাবে না? কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্ত, বৈধ হকারদের কি সরানো হয়েছে? রেল স্টল করে বসার ব্যবস্থা করেছিল, তাঁদের উচ্ছেদের ঘটনা আছে কি?”__আদালত রেলকে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা আকারে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। রিপোর্টে জানাতে হবে: ১. কতজন হকারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে ও কতজন বৈধ লাইসেন্সধারী। ২. উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৩. ২০১৪ সালের পথ বিক্রেতা আইন মেনে টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন হয়েছে কি না। __পাশাপাশি আদালত স্পষ্ট করেছে, বৈধভাবে ব্যবসা করা হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া সরানো যাবে না। পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে উচ্ছেদ করা যাবে না।
.প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি:
__আদালতের নির্দেশের পর বারুইপুর স্টেশনের হকার শেখ রহমত বলেন, “৩০ বছর ধরে চা বিক্রি করি। হঠাৎ নোটিশ পেয়ে ঘুম উড়ে গিয়েছিল। কোর্টের রায়ে প্রাণ ফিরে পেলাম।” ডানকুনির ফল বিক্রেতা সবিতা দাসের কথায়, “দুই ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে। দোকান উঠে গেলে না খেয়ে মরতে হত।”__হকার সংগঠনগুলির দাবি, শুধু স্থগিতাদেশ নয়, স্থায়ী পুনর্বাসন ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। ‘হকার সংগ্রাম কমিটি’র সম্পাদক শক্তিমান ঘোষ বলেন, “রেল ও রাজ্যকে যৌথভাবে ভেন্ডিং জোন চিহ্নিত করতে হবে। ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় আইন মানতে হবে।”__আপাতত পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত উচ্ছেদ বন্ধ থাকায় রেল চত্বরের হাজার হাজার পরিবার সাময়িক স্বস্তিতে। তবে চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটছে না।