আমাদের ভাবনা ছিল, মানুষ বোধহয় থিতু হওয়ার পরেই ধীরে ধীরে নেশা করতে শিখেছে। যখন চাষবাস শিখল, ঘর বাঁধল, শস্য মজুত করতে শিখল, তখনই হয়তো গাঁজিয়ে মদ বানানোর কৌশলটাও আয়ত্ত করল। কিন্তু আমাদের সেই আগের ভাবনা এখন সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে, কারণ নতুন গবেষণা বলছে, এই গল্পটা অনেকটাই পুরনো। মানুষ যখন আজকের মতো মানুষও হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি, যখন পাথরের গুহাই ছিল মানুষের ঘর, আর শিকার করাই ছিল একমাত্র জীবিকা, তখনই মানুষ নেশার স্বাদ পেয়ে গিয়েছিল।
অতি সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের গভীর গুহার মধ্যে পাওয়া মানুষের দু’টি প্রাচীন কঙ্কালের দাঁত পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
গুহার অন্ধকারের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ২৫ হাজার বছরের একটি অভ্যাস, যা বহমান নদীর মতো এখনও বোয়ে চলেছে। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা, ইন্দোনেশিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সঙ্গে যৌথভাবেই তাঁরা গবেষণায় নেমেছিলেন। যৌথ গবেষক দেশের গবেষক সুলাওয়েসির একটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুহা থেকে দু’জন আদিম মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পান।
তাদের কার্বন ডেটিং করে দেখা যায়, প্রথম ব্যক্তি বেঁচে ছিলেন আজ থেকে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ১৬,০০০ বছর আগে। অর্থাৎ, শেষ বরফ যুগের সময়। তখনও পর্যন্ত কৃষির কোনো ধারণাই মানুষের মধ্যে ছিল না। দ্বিতীয় ব্যক্তি তুলনামূলকভাবে নতুন, প্রায় ৭,৬০০ থেকে ৬,৩০০ বছর আগের।
এই দু’জনের দাঁত পর্যবেক্ষণ করতেই গবেষকদের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। দু’জনেরই দাঁতের উপরিভাগে এক অদ্ভুত ক্ষয় তাঁরা লক্ষ করেন। সামনের দিকের দাঁতগুলোতে গভীর, প্রায় গোলাকার, বাটির মতো গর্ত। সাধারণত শক্ত খাবার খেলে বা পোকা লাগলে এমন ক্ষয় হয় না। এটি অনেকটা আস্ত কোনো শক্ত বীজ দিনের পর দিন মুখে রেখে চোষার ফলেই হয়ে থাকে।
এই অভিজ্ঞ প্রত্নতাত্ত্বিকদের মনে পড়ে যায় আধুনিক সময়ে মানুষের সুপারি খাওয়ার অভ্যাসের কথা। যারা দীর্ঘদিন ধরে গোটা সুপারি চোষেন, তাদের দাঁতেও ঠিক এই ধরনের ক্ষয় দেখা যায়।
তাঁদের সন্দেহ নিরসন করতে বিজ্ঞানীরা দাঁতের আরও সূক্ষ্ম কিছু পরীক্ষা করেন। তাঁরা দাঁতের টিস্যু থেকে নমুনা নিয়ে ল্যাবে বায়োকেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করেন। আর সেখানেই মেলে অকাট্য প্রমাণ। দাঁতের ভিতরে পাওয়া যায় Arecoline নামক একটি অ্যালকালয়েড। এটি সুপারি গাছের বীজের প্রধান সক্রিয় উপাদান। এই রাসায়নিকই মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, হালকা উত্তেজনা, সতর্কতা এবং ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। একে বলে সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ।
এই যুগান্তকারী গবেষণার প্রধান লেখক অ্যাডাম ব্রুম পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, সুপারি ভেঙে বা গুঁড়ো না করেও, শুধু গোটা অবস্থায় মুখে রেখে চুষলেও যথেষ্ট পরিমাণে Arecoline নির্গত হয়, যা শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, প্রাচীন মানুষকে পান-সুপারির মতো জটিল প্রক্রিয়াও জানতে হয়নি, শুধু চোষাই যথেষ্ট ছিল।
এই গবেষণার ফলাফল বিশ্ববাসীর নজরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের টাইমলাইনও বদলে গেল। এতদিন পর্যন্ত নেশার সবচেয়ে পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে ধরা হতো প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের একটি গাঁজানো ফলের পানীয়কে, যা ইসরায়েলের একটি গুহায় পাওয়া গিয়েছিল।
কিন্তু সুলাওয়েসির এই আবিষ্কার সেই রেকর্ডকে প্রায় দ্বিগুণ পিছিয়ে দিল। এটি প্রমাণ করল যে, মানুষ কৃষিকাজ শুরুর প্রায় ১৩ থেকে ১৫ হাজার বছর আগেই মাদকীয় উদ্ভিদের ব্যবহার জানত। তার মানে, শিকারি-সংগ্রাহক জীবনেও মানুষ শুধু পেট ভরানোর জন্য গাছ চিনত না, কোন গাছে ব্যথা কমে, কোন গাছে মন ফুরফুরে হয়, তাও পরীক্ষা করে দেখত।
এখন প্রশ্ন হলো, তারা কেন সুপারি খেত? নেশার জন্য নাকি রোগ সারানোর জন্য? গবেষকদের মতে, এর পিছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিছক নেশার আনন্দ। দ্বিতীয়ত, ওষুধ হিসেবে। ওষুধ কেন? কারণটা নীচে দেখুন…..
Arecoline-এর মধ্যে সামান্য ব্যথানাশক গুণ আছে। প্রাচীন মানুষের মুখের স্বাস্থ্য খুব খারাপ ছিল। দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির সংক্রমণ ছিল সাধারণ ঘটনা। হয়তো দাঁতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই তারা সুপারি চোষা শুরু করেছিলেন, যা পরে অভ্যাসে পরিণত হয়।
তবে মানুষকে এই অভ্যাসের মূল্যও সেসময় দিতে হয়েছে। ক্রমাগত শক্ত বীজ চোষার ফলে তাদের দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যেত, অনেক সময় দাঁতের ভিতরের নরম অংশ, পাল্প পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে যেত, যা থেকে রক্তে বিষক্রিয়া পর্যন্ত হতে পারত। অর্থাৎ, সাময়িক স্বস্তির জন্য তারা বড় ঝুঁকিও নিত।
আজ থেকে ২৫ হাজার বছর আগে সুলাওয়েসির গুহায় বসে যে মানুষটি সুপারি চুষছিল, তার সঙ্গে আজকের এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের আশ্চর্য মিল পাওয়া যাচ্ছে। আজও Areca catechu গাছের বীজ, চুন ও পানের পাতা দিয়ে যে পান তৈরি হয়, তা বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক ব্যবহৃত নেশার দ্রব্য — অ্যালকোহল, ক্যাফিন এবং তামাকের পরেই তার স্থান।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সুলাওয়েসির দাঁতের সেই ক্ষত প্রমাণ করে দিল, নেশা কোনো আধুনিক সভ্যতার বিকার নয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একেবারে আদিমতম অধ্যায় থেকেই মানুষ এমন উদ্ভিদ খুঁজেছে, যা তাকে যন্ত্রণা ভুলিয়ে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারে। আজও তার ধারা ব্যাহত হয়নি।