পাঁশকুড়ার কাঁসাই নদীতে বিশালাকার কুমির, আতঙ্কে এলাকাবাসী, মাইকে সতর্কতা প্রশাসনের
পাঁশকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর: কংসাবতী বা কাঁসাই নদীতে বিশালাকার কুমিরের দেখা মেলায় চাঞ্চল্য ছড়াল পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই লকগেট সরাইঘাট এলাকায় নদীর পাড়ে কুমিরটিকে ভেসে থাকতে দেখেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভিড় জমে যায়। আতঙ্কিত এলাকাবাসীর নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইক প্রচার করে সতর্ক করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কুমিরটি প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট লম্বা। মাঝে মাঝেই জল থেকে মাথা তুলে আবার ডুব দিচ্ছে। বনদফতর ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কুমিরের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। নদীতে নামতে নিষেধ করা হয়েছে।
এই ঘটনা নতুন নয়। গত বছর বন্যার সময় ওড়িশা এবং দক্ষিণবঙ্গে একাধিক জায়গায় নদীর জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুমির লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পাঁশকুড়ার লকগেট সরাইঘাট এলাকায় কুমিরের দেখা মিলেছে বলে সাম্প্রতিক ভিডিওতেও উঠে এসেছে।
পাঁশকুড়া থানা এবং বনদফতরের যৌথ উদ্যোগে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে মাইকিং করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কেউ যেন নদীতে স্নান করতে, মাছ ধরতে বা গবাদি পশু নিয়ে না নামেন। সন্ধ্যার পর নদীর ধারে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বনকর্মীরা কুমিরটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় ছাড়ার পরিকল্পনা করছে।
কুমির কেন নিজের এলাকা ছেড়ে কাঁসাইতে আসছে? বিশেষজ্ঞদের যুক্তি ৫টি
কাঁসাই নদী সাধারণত কুমিরের স্বাভাবিক বাসস্থান নয়। সুন্দরবন, ভিতরকণিকা বা ওড়িশার ব্রাহ্মণী নদী কুমিরের আদি বাসস্থান। সেখান থেকে এত ভেতরে চলে আসার পেছনে পরিবেশবিদরা কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন।
১. ডিভিসির জল ছাড়া ও বন্যার স্রোত: গত কয়েকদিন ধরে মুকুটমণিপুর ও ডিভিসি থেকে প্রচুর জল ছাড়া হয়েছে। কাঁসাই নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে গেছে। পাহাড়ি নদীর স্রোতের টানে কুমির ভেসে আসতে পারে। ওড়িশার বন্যার সময়ও নদীর পাড় ভেঙে কুমির গ্রামে ঢুকে পড়েছিল বলে রিপোর্ট রয়েছে।
২. খাদ্যের অভাব ও বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন: সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া কমে যাওয়া এবং মানুষের অবাধ প্রবেশের ফলে কুমিরের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হচ্ছে। খাবারের খোঁজে কুমির নতুন এলাকায় চলে আসছে।
৩. বাসস্থান দখল ও দূষণ: নদীপাড়ে অবৈধ বালি খাদান, কলকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণে কুমিরের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে। ফলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উজানে চলে আসছে।
৪. প্রজনন মরশুমে বিচরণ: বর্ষাকাল কুমিরের প্রজনন ও বিচরণের সময়। এই সময় পুরুষ কুমির নতুন এলাকা দখলের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়।
৫. জলবায়ু পরিবর্তন: সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি ও নদীর নোনা জল ঢুকে পড়ায় সুন্দরবনের মিষ্টি জলের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে কুমির মিষ্টি জলের নদীর দিকে সরে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমিরটিকে মেরে ফেলা বা আঘাত করা উচিত নয়। এটি একটি বিপন্ন প্রাণী এবং বন্যপ্রাণ আইনে সংরক্ষিত। আতঙ্কিত না হয়ে প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা এবং বনদফতরকে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।