একটি নিষ্পাপ ছবি। একটি অন্তিম আকুতি। আর একটি নিষ্ঠুর রাতের ভয়ঙ্কর থাবা। জাহালদার নিরঞ্জন প্রধান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের করুণ পরিণতি!
যে মানুষটা কিশোর বয়সে ” ইংরেজ ভারত ছাড়ো” স্লোগান দেওয়ার জন্য পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মিছিলে হেঁটেছেন, প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উন্মাদনায় আত্মহারা হয়েছেন, সেই মানুষটিকেই আজ স্বাধীনতা লাভের ৮০ বছর পর—
শুধুমাত্র একটি ঘর, একটিমাত্র ঘরের স্বপ্নে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে !
এই ছবিতে যে বৃদ্ধকে দেখছেন লাঠি হাতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, এটা ৩০শে আগস্টের ২০২৬-এর ছবি। এই বৃদ্ধ নাগরিক পশ্চিম মেদিনীপুরের জাহালদার বাসিন্দা নিরঞ্জন প্রধান। বয়স ৯৫ বছর। তিনি খবর পেয়েছিলেন, ওই রাস্তা দিয়েই এগরা-ভবানীচক হয়ে কাঁথির দিকে যাবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, যাঁকে এলাকার মানুষ নিজেদের বাড়ির ছেলে হিসেবেই ভালোবাসেন।
জাহালদার রাস্তায় একটাই আশা নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাট-আউটের পাশে। কোনও রাজনৈতিক স্লোগান নয়, কোনও অভিযোগ নয়, শুধু দু’হাত জোড় করে একটি প্রার্থনা — “আমাকে একটা পাকা ঘর দিন। মাথার ওপর একটা ছাদ দিন।”
কেবলমাত্র এইটুকুই ছিল তাঁর চাওয়া। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস যে এতটা নির্মম হতে পারে, তা কে জানত? যেই ভাঙাচোরা মাটির ঘরটার পরিবর্তে একটা পাকা ঘরের জন্য তিনি দিনের আলোয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আবেদন করলেন, সেই ঘরটাই রাতের অন্ধকারে যমদূত হয়ে নেমে এলো তাঁর পরিবারের ওপর।
ওই রাতেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল তাঁর জরাজীর্ণ মাটির বাড়ি। কাঁচা দেওয়াল, ভেজা মাটি, পচা বাঁশের কাঠামো — সব একসঙ্গে ধসে পড়ল ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপর।
শব্দ শুনে মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে এলেন প্রতিবেশীরা। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকেই উদ্ধার করলেন নিরঞ্জন প্রধান এবং তাঁর মেয়ে দুর্গা প্রধানের নিথর দেহ। বাবা ও মেয়ে, দু’জনেই শেষ। পরিবারের আরও দু’জন গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন।
একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল। একটা স্বপ্ন শেষ গেল শুধু প্রশাসনের সঠিক কাজ না করার কারণে।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়ে গেল পরিচিত চিত্রনাট্য। কমেন্ট বক্সে তৃণমূল বনাম বিজেপির কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেল, দাপিয়ে বেড়ালো দোষারোপের পালা। কিন্তু এই মৃত্যু মিছিলের রাজনীতির মাঝে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে গেল।
প্রশ্নটা হল — গত দশ বছরে যখন বিগত রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাংলা আবাস যোজনায় পাকা বাড়ি করে দেওয়া হয়েছে, তখন নিরঞ্জন প্রধানের মতো মানুষরা কীভাবে বাদ পড়ে গেলেন?
তাঁর কাগজে কি কোনও ভুল ছিল? তাঁর আধার কার্ড, ভোটার কার্ডে কি কোনও ত্রুটি ছিল, নাকি ত্রুটি ছিল অন্য কোথাও? কী সেই ত্রুটি? কী সেই অজ্ঞাত কারণ ?
আমরা যারা গ্রামে-গঞ্জে থাকি, আমরা তো নিজের চোখে দেখি বাস্তব চিত্রটা কী। দেখি, যাঁদের দোতলা পাকা বাড়ি, গ্যারেজে গাড়ি, তাঁদের নামেও আবাস যোজনার ঘর স্যাংশন হয়েছে। দেখি, সরকারি টাকা পেয়ে সেই টাকার ভাগ দিতে হয়েছে কোথাও কোথাও, আর তাই ঘর অর্ধেক তৈরি করেই কঙ্কালের মতো ফেলে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। সেই ঘরে মানুষ থাকে না, ছাগল-গরু থাকে।
আবার এও শুনছি-দেখছি , এখন বর্তমান প্রশাসনই হাজার হাজার ভুয়ো প্রাপককে চিহ্নিত করে টাকা ফেরতের নোটিশ পর্যন্ত পাঠাচ্ছে। যারা ঘর পাওয়ার যোগ্যই নন, তারা কীভাবে টাকা পেলেন?
আর যাঁরা প্রকৃত যোগ্য, যাঁদের সত্যিই মাথার ওপর ছাদ নেই, তাঁরা কেন বঞ্চিত হলেন? কে দেবে এর উত্তর?
তবে জাহালদার স্থানীয় মানুষদের মুখে মুখে ঘুরছে এক মর্মান্তিক অভিযোগ। অনেকেই বলছেন, নিরঞ্জন প্রধান বিজেপি সমর্থক ছিলেন বলেই নাকি তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘর দেওয়া হয়নি। এমনকি বার্ধক্য ভাতা থেকেও নাকি তিনি বঞ্চিত ছিলেন।
এই অভিযোগ যদি এক শতাংশও সত্যি হয়, তাহলে এর থেকে বড় লজ্জা, এর থেকে বড় পাপ আর কিছু হতে পারে না। একটি সরকারি প্রকল্প, একটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার — তা কি কখনও রাজনৈতিক রঙ দেখে বিচার হতে পারে? একটি ঘর কি তৃণমূল বা বিজেপি দেখে দেওয়া হবে?
ঘরের কোনও রঙ হয় না। ক্ষুধার কোনও দল হয় না। মৃত্যুর কোনও রাজনীতি হয় না। কিন্তু স্বার্থের রাজনীতি হয়, আর সেই রাজনীতি বড়ো বেদনার ও নিষ্ঠুর।
তাই বর্তমান সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে আমাদের করজোড়ে একটাই অনুরোধ — রাজনীতি অনেক হবে, তরজা অনেক হবে, কিন্তু তার আগে মানুষগুলোকে বাঁচান। অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করুন। এই তো কিছুদিন আগে দেখলাম এই নতুন সরকারের আমলেই আবাস যোজনার সার্ভে হলো, দেখলাম নতুন ঝাঁ চকচকে বাড়ি না দেখিয়ে কেউ কেউ পুরাতন ভেঙে পড়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর সার্ভে অফিসার ছবি তুলছেন। আসলে এই লোভটি নিরঞ্জন প্রধানদের ছিল না। নিরঞ্জন প্রধানদের মতো নির্লোভ ব্যক্তিরা কীভাবে ঘুষ দিয়ে অধিকার আদায় করতে হয় তা জানেন না।
দয়া করে আর ফাইলে আটকে রাখবেন না। মাঠে নামুন। সঠিকভাবে সার্ভে করুন। পঞ্চায়েত অফিসে বসে লিস্ট বানাবেন না, গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখুন কার চাল ফুটো, কার দেওয়াল ভাঙা, কে রাতে বৃষ্টি হলে জেগে বসে থাকে।
নিরঞ্জন প্রধানের মতো মানুষদের আগে খুঁজে বের করুন। তাঁদের একটা পাকা ছাদ দিন। যাতে অন্তত তাঁরা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, এই ভয় ছাড়া যে, সকালে আর ঘুম ভাঙবে তো?
একটা ঘর দিতে পারলেন না, দু’টো প্রাণ চলে গেল। এই দায় আমরা কেউ এড়াতে পারি না। যে ঘরের স্বপ্ন দেখেছিলেন নিরঞ্জন, সেই ঘরই কেড়ে নিল তাঁর জীবন — পশ্চিম মেদিনীপুরের জাহালদায় মাটির দেওয়ালে চাপা পড়ে বৃদ্ধ পিতা এবং তাঁর কন্যার মৃত্যু ঘিরে বিস্তর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
সারা বাংলা জুড়ে খুঁজলে এমন হাজার হাজার নিরঞ্জন প্রধানকে পাবেন, যাঁরা আজও মাটির ঘরে থাকে, যাঁরা জানেন না আজকের রাতটাই তাঁদের শেষ রাত কিনা।
আজ নিরঞ্জন প্রধান নেই। তাঁর মেয়ে নেই। কিন্তু তাঁদের এই মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল — আমরা কতটা ব্যর্থ ! আমরা কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন! এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত প্রয়াত নিরঞ্জন প্রধানের বাড়ির আহত বাকি দুই জনের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য আমার হাতে এসে পৌঁছায়নি। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি তাঁরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে ফিরুন। ভালো থাকুন।