শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিবসে ছুটি ও উদ্যাপনের জোড়া নির্দেশে বিভ্রান্ত শিক্ষামহল
ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী ৬ জুলাই। রাজ্য সরকার ওই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। কিন্তু এরই পাশাপাশি বিকাশ ভবন থেকে নির্দেশ এসেছে, ছুটির দিনেই রাজ্যের সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর জন্মদিন পালন করতে হবে। একদিকে ছুটি, অন্যদিকে উদ্যাপনের বাধ্যবাধকতা — দুই বিপরীত নির্দেশে চরম ধন্দে পড়েছেন শিক্ষক, পড়ুয়া ও শিক্ষাকর্মীরা।
চলতি বছরের মে মাসে রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা সামনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সূত্রেই রাজ্যের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ জুন দিবস পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুদিন থেকে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ‘ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পক্ষ’। ঠিক হয়, ২৩ জুন থেকে ৬ জুলাই তাঁর জন্মদিন পর্যন্ত স্কুল-কলেজে আলোচনাসভা, প্রবন্ধ লেখা, ক্যুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি চলবে।
এই কর্মসূচি চলার মধ্যেই জুন মাসে সরকার ঘোষণা করে, ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিনে রাজ্যে সরকারি ছুটি থাকবে। শিক্ষামহল স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিল, ছুটির দিনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
কিন্তু ১ জুলাই বিকাশ ভবন থেকে নতুন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। সেখানে বলা হয়, ৬ জুলাই পড়ুয়া ও শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান করতেই হবে। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিয়ো ওই দিনই ই-মেল করে শিক্ষা দফতরে পাঠাতে হবে। এই নির্দেশ আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে বিভ্রান্তি।
ছুটির দিনে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে। বন্ধ প্রতিষ্ঠানে কীভাবে অনুষ্ঠান হবে, কারা উপস্থিত থাকবে — বিজ্ঞপ্তিতে তার কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ছুটির দিনে পড়ুয়া বা শিক্ষকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা যায় না। আবার অনুষ্ঠান না করলে সরকারি নির্দেশ অমান্য করার দায় এসে পড়বে প্রধান শিক্ষকদের ঘাড়ে। ফলে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা উভয় সংকটে পড়েছেন।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “প্রথমে ছুটি ঘোষণা, তারপর উদ্যাপনের নির্দেশ — এটা সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। আমরা শিক্ষা দফতরে চিঠি দিয়ে দ্রুত স্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি চেয়েছি।”
অনেক প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য, ১৫ অগস্ট বা ২৬ জানুয়ারির মতো জাতীয় দিবসে ছুটি থাকলেও সকালে পতাকা তোলার রেওয়াজ আছে। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ জয়ন্তীতে এই প্রথম ছুটির সঙ্গে বাধ্যতামূলক উদ্যাপনের নির্দেশ আসায় তাঁরা অন্ধকারে
শিক্ষা দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, জাতীয় দিবসের মতোই ৬ জুলাই সকালে এক-দু’ঘণ্টার ‘কমেমোরেটিভ প্রোগ্রাম’ করা যেতে পারে। ছুটি মানে সারাদিন প্রতিষ্ঠান তালাবন্ধ রাখতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। তবে এই মৌখিক ব্যাখ্যা লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে না থাকায় বিভ্রান্তি কাটছে না।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের অন্যতম কারিগর। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, গত ৮০ বছর তাঁর অবদানকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। রাজ্যে সরকার বদলের পর ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন এবং শ্যামাপ্রসাদকে সামনে আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শিক্ষা দফতর দ্রুত সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাতে পারে যে অনুষ্ঠান ৫ বা ৭ জুলাই করা যাবে, অথবা অনলাইনে পালন করলেও চলবে। আবার ৬ জুলাই সকালের দিকে ৩০ মিনিটের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন কর্মসূচি করে ছবি পাঠানোর নির্দেশও আসতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনা হল, উপস্থিতি বাধ্যতামূলক না করে ‘যথাসম্ভব’ উদ্যাপন করতে বলা।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান নিয়ে চর্চা হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশাসনিক নির্দেশে অস্পষ্টতা থাকলে মহৎ উদ্দেশ্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ৬ জুলাইয়ের আগে বিকাশ ভবন থেকে সুস্পষ্ট গাইডলাইন না এলে রাজ্যের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অহেতুক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। শিক্ষার পরিবেশকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।