যে বাবা দুপুরে নিজের হাতে ভাত মেখে ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন, আদর করে বলছিলেন – “আজ আর বাইরে যাস না বাবা, চল একসাথে বসে সিনেমা দেখি” – সেই বাবাকেই কয়েক ঘণ্টা পর পাগলের মতো ছুটতে হয়েছে এক গলি থেকে আরেক গলিতে, এক ফোন থেকে আরেক ফোনে। শুধু একটাই প্রশ্ন – “আমার ছেলেটা কোথায়?”
আর শনিবার দুপুরে ছেলে ফিরেছে অন্যরূপে– অন্যভাবে। হ্যাঁ অপ্রতিম ফিরেছে, দেরি করে ফিরেছে। কিন্তু যে অপ্রতিমকে বাবা আদর করে খাইয়েছিলেন, সেই অপ্রতিমের নিথর দেহ ফিরেছে। ফিরেছে কেবল তার নিথর, নিশ্চুপ শরীরটা। যে মুখে দুপুরে হাসি লেগেছিল, সেই মুখ আজ চিরদিনের জন্য চুপ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গের ঘরে বাইরে এখন আবেঘন চর্চায় চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া অপ্রতিম। সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে মা ছেলে বাবার স্মৃতির ভিডিও ঘিরে মানুষের কান্নার রোল।
দিনটি ছিল শুক্রবার। ছুটির দুপুর। ঘরের ভেতর বাবা-ছেলের একান্ত সময়। মা হয়তো রান্নাঘরে, টিভিতে কোনো সিনেমা চলছে। বাবা নিজের হাতে ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন। এই দৃশ্য তো আমাদের প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাড়ির চেনা দৃশ্য। কত মায়া, কত মমতা জড়িয়ে থাকে ওই এক গ্রাস ভাতের মধ্যে। বাবা বলেছিলেন, বাইরে যাস না। হয়তো মনে কোনো অজানা আশঙ্কা ছিল, হয়তো শুধুই বাবার আদুরে শাসন। কে জানত, ওই কথাটাই শেষ কথা হয়ে যাবে?
বিকেল গড়াতেই সব ওলটপালট। ছেলে বেরিয়েছিল, হয়তো বন্ধুদের ডাকে, হয়তো সামান্য কোনো কাজে। তারপর আর ফেরেনি। প্রথমে দেরি হচ্ছে ভেবে অপেক্ষা, তারপর ফোনে ফোনে খোঁজ। ফোন বেজে যায়, কেউ ধরে না। সন্ধ্যা নামে, আঁধার ঘন হয়, আর বাবার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হতে থাকে।
সারা রাত – একটা গোটা রাত – এক বাবা তার সন্তানকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। পাড়ার প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি মোড়ে, বন্ধুদের বাড়িতে, থানায়। যে বাবা দুপুরে ছেলেকে বুকে টেনে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা করছিলেন, সেই বাবা রাতের অন্ধকারে রাস্তায় রাস্তায় ছেলের নাম ধরে ডেকেছেন। “অপ্রতিম… বাবা অপ্রতিম…” সেই ডাক অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে, কোনো উত্তর আসেনি।
মা’র অবস্থা ভাবুন একবার। যে মা দুপুরে দেখেছিলেন ছেলে বাবার হাতে খাচ্ছে, সেই মা রাতভর দরজার দিকে তাকিয়ে। প্রতিটি বাইকের আওয়াজে মনে হচ্ছে ছেলে এলো বুঝি। প্রতিটি পদশব্দে বুক কেঁপে উঠছে।
অবশেষে খবর এলো শনিবার। কিন্তু এ কোন খবর? যে খবরের জন্য রাতভর অপেক্ষা, সেই খবরই যেন না আসত। অপ্রতিম ফিরেছে, কিন্তু জীবন্ত নয়। তার দেহ ফিরেছে, প্রাণ ফেরেনি।
যে বাড়ি থেকে শুক্রবার দুপুরে হাসির শব্দ ভেসে আসছিল, সেই বাড়িতেই শনিবার দুপুরে কান্নার রোল। পাড়া-প্রতিবেশী ভেঙে পড়েছেন। কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই তো সেদিন যে ছেলেটা গলিতে ক্রিকেট খেলছিল, সাইকেল চালিয়ে টিউশন যাচ্ছিল, সে আজ নেই – এটা কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?
বাবা নির্বাক। যে বাবা নিজের হাতে শেষবার খাইয়েছিলেন, সেই হাত দুটো আজ কাঁপছে। তিনি ছেলের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, হয়তো ভাবছেন – যদি আরেকটু জোর করে আটকে রাখতাম, যদি হাতটা ধরে রাখতাম, তাহলে কি আজকের দুপুরটা অন্যরকম হতো?
একজন বাবার কাছে তার সন্তানের নিথর দেহ বহন করার চেয়ে ভারী আর কিছু নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা। শুক্রবার দুপুরে যে বাবা ছেলেকে বলেছিলেন “বাইরে যেও না”, আজ সেই বাবা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছেন – কেন যেতে দিলাম?
অপ্রতিম নামের অর্থই তো যার কোনো প্রতিমা নেই, অতুলনীয়। সত্যিই, প্রতিটি সন্তানই তো তার বাবা-মায়ের কাছে অপ্রতিম, অতুলনীয়। তার কোনো বিকল্প হয় না।
আজ ওই বাড়িতে টিভিটা হয়তো বন্ধ। যে সিনেমাটা বাবা-ছেলে মিলে দেখবে বলেছিল, সেটা আর দেখা হলো না। অসমাপ্ত থেকে গেল একটা দুপুর, একটা সিনেমা, আর একটা গোটা জীবন।
অপ্রতিম চলে গেল, রেখে গেল এক বুক হাহাকার। আর রেখে গেল একটা শিক্ষা – প্রিয়জনকে কাছে পেলে আরো একটু শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। কারণ কে জানে, কোন দুপুরটা শেষ দুপুর হয়ে যায়।