তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার পিংলার প্রাক্তন বিধায়ক অজিত মাইতি, তোলপাড় রাজ্য-রাজনীতি
পশ্চিম মেদিনীপুরের রাজনীতিতে বড়সড় আলোড়ন। তোলাবাজি ও আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন পিংলার প্রাক্তন বিধায়ক এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা অজিত মাইতি। শুক্রবার ভোরবেলায় খড়গপুরের মাদপুরে নিজের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পিংলা থানার পুলিশ।
সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, গ্রেফতারের পর তাঁকে প্রথমে পিংলা থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে নিরাপত্তার কারণে ডেবরা থানায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত তাঁকে ডেবরা থানাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে দাবি, অজিত মাইতির বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক প্রতারণা ও তোলাবাজির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী গোবিন্দ দাস নামে এক তৃণমূল কর্মীর দাবি, দলীয় পদ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক।
গোবিন্দ দাসের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সংগঠনে ভালো পদ এবং পঞ্চায়েত স্তরে দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন কেটে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি, টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। এরপরই তিনি পিংলা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার আর্থিক প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং তোলাবাজির ধারায় মামলা রুজু করে।
যদিও গ্রেফতারের সঠিক কারণ নিয়ে প্রথম দিকে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, পরে পুলিশের তরফে এই আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগের কথাই সামনে আনা হয়েছে।
অজিত মাইতি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পরিচিত মুখ। তিনি পিংলা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক। শুধু বিধায়কই নন, একসময় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বও সামলেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দলের পুরনো কর্মী হিসেবেই জেলায় তাঁর পরিচিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পিংলা ও ডেবরা এলাকায় তৃণমূলের সংগঠনকে তিনিই কার্যত নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সেই কারণেই তাঁর গ্রেফতারিতে জেলার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিরোধী শিবির, বিশেষ করে বিজেপি এবং সিপিআইএম-এর তরফে দাবি করা হচ্ছে, এটি তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং কাটমানি সংস্কৃতিরই ফল। তৃণমূলের ভেতরেই টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি হয়, এই গ্রেফতারি তারই প্রমাণ বলে কটাক্ষ করেছে বিরোধীরা।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা নেতৃত্বের একাংশের বক্তব্য, আইন আইনের পথে চলবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল কড়া পদক্ষেপ নেবে। তবে এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়, এর সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। দলের এক জেলা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনও আর্থিক লেনদেন করে থাকেন, তার দায় দল নেবে না। পুলিশ তদন্ত করছে, সত্য সামনে আসবে।”
ভোরবেলায় প্রাক্তন বিধায়কের বাড়িতে পুলিশি অভিযান এবং গ্রেফতারির খবর ছড়িয়ে পড়তেই খড়গপুরের মাদপুর এবং পিংলা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। বহু তৃণমূল কর্মী-সমর্থক থানার সামনে ভিড় জমান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, আজই তাঁকে খড়গপুর মহকুমা আদালতে তোলা হবে এবং পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে। তদন্তকারীরা দেখতে চান, এই আর্থিক লেনদেনের পিছনে আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা এবং এই ধরনের অভিযোগ আর কারও কাছ থেকে এসেছে কিনা।
আপাতত গোটা ঘটনার দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। একজন প্রাক্তন বিধায়ক ও জেলা সভাপতির গ্রেফতারি যে শাসক দলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়াবে, তা বলাই বাহুল্য।