মুরগির ডিমের দাম বাড়তেই বাজারে হানা দিয়েছে ‘কৃত্রিম ডিম’। দেখতে একেবারে অবিকল। খোলস, কুসুম, সাদা অংশ — সবই আছে। কিন্তু ভাঙলেই সন্দেহ। গন্ধ নেই, আবার ভাজার পর রাবারের মতো হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে কৃত্রিম ডিম বিক্রির অভিযোগ ঘিরে তুঙ্গে আতঙ্ক।
কী এই কৃত্রিম ডিম?
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম ডিম তৈরি হয় মূলত রাসায়নিক দিয়ে।
১) খোলস:– ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, প্যারাফিন ওয়াক্স, জিপসাম পাউডার দিয়ে তৈরি।
২) ডিমের সাদা অংশ:– সোডিয়াম অ্যালজিনেট, জিলেটিন, ফটকিরি, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড।
৩) কুসুম:– একই রাসায়নিকের সঙ্গে খাবার রং মিশিয়ে হলুদ রং আনা হয়।
একটি ছাঁচে এই মিশ্রণ ফেলে ‘ডিম’-এর আকার দেওয়া হয়। উৎপাদন খরচ আসল ডিমের অর্ধেকেরও কম। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় বাজারে ছাড়ছে।
কীভাবে চিনবেন আসল-নকল?
ফুড সেফটি দফতরের আধিকারিকরা কয়েকটি সহজ উপায় বলছেন:—
আসল :— ঝাঁকালে কোনো শব্দ হয় না,
কৃত্রিম:– ঝাঁকালে জলের মতো শব্দ হয়।
আসল:– আগুনে পোড়ালে পোড়া গন্ধ এবং ছাই হয়, নকল:– আগুনে পোড়ালে প্লাস্টিক পোড়া গন্ধ হয় এবং রাবারের মতো গলে যায়।
আসল:– ভাজার পর কুসুম বসে যায় ও স্বাভাবিক গন্ধ হয়, নকল:– ভাজার পর রাবারের মতো শক্ত ও গন্ধ হয় না।
আসল:– খোলস একটু অমসৃণ থাকে ও ছিদ্র থাকে,
নকল:– অতিরিক্ত মসৃণ ও চকচকে হয়।
আসল:– জলে দিলে টাটকা ডিম ডুবে যায়,
নকল:– অনেক সময় ভেসে থাকে।
স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর?
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুষ্টিবিদ ডাঃ অনন্যা সেন বলেন, “এই ডিমে কোনও প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল নেই। উল্টে সোডিয়াম অ্যালজিনেট, ফটকিরি, প্যারাফিনের মতো রাসায়নিক শরীরে গেলে পেটের রোগ, লিভার-কিডনির ক্ষতি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন খেলে স্নায়ুর সমস্যাও হতে পারে।”
কোথায় মিলছে অভিযোগ?
গত সপ্তাহে বেহালা, গড়িয়া, হাওড়ার সালকিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরের বাজার থেকে কৃত্রিম ডিম উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি ক্রেতাদের। মানিকতলা বাজারের ডিম বিক্রেতা সুবল দাস বলেন, “পাইকারি মার্কেটে ৩ টাকা পিস চাইছে। আমরা ৫ টাকায় বিক্রি করি। আসল ডিম এখন ৭.৫০–৮.০০ টাকা। খদ্দের সস্তা দেখে ওটাই নিচ্ছে।”
প্রশাসন কী বলছে?
রাজ্যের ফুড সেফটি কমিশনার তপন কান্তি রুদ্র জানান, “আমরা বিভিন্ন বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করছি। ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে FSS Act 2006 অনুযায়ী কড়া ব্যবস্থা নেব। কৃত্রিম ডিম তৈরি ও বিক্রি দুটোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৬ মাস থেকে ৩ বছর জেল ও ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।”
ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের টোল ফ্রি নম্বর 1800-345-1947-এ অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।
সতর্ক থাকুন
১. খুব কম দামে ডিম বিক্রি হলে সন্দেহ করুন।
২. পরিচিত দোকান থেকে ডিম কিনুন।
৩. কেনার পর জলে ডুবিয়ে ও ঝাঁকিয়ে পরীক্ষা করুন।
৪. ভাঙার পর গন্ধ না পেলে বা রাবারের মতো হলে খাবেন না।
ডিমকে বলা হয় ‘গরিবের প্রোটিন’। সেই ডিমেই যদি ভেজাল ঢোকে, তবে জনস্বাস্থ্য বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই সস্তার ফাঁদে পা না দিয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।