যোগেন চৌধুরী : শিকড় থেকে শিখরে, রেখার বিদ্রোহে এক সচেতন শিল্পীর মহাপ্রস্থান
২৫ অক্টোবর ২০২৬, মুঠোকথা.in : বাংলার চিত্রকলার মহাআকাশে যে কয়েকটি নাম নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে, যোগেন চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত এই বাঙালি চিত্রকর শুধু তুলির আঁচড়েই নয়, এই সমাজের কদর্য রূপকে ব্যঙ্গের কশাঘাতে উন্মোচিত করেও হয়ে উঠেছিলেন প্রাসঙ্গিক। রবিবার কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। দীর্ঘ চোদ্দ মাস রক্তের বিরল ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। শেষ দশদিন সংক্রমণজনিত জটিলতায় একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন । অবশেষে ৮৭ বছর বয়সে থেমে গেল এক বর্ণময় অধ্যায়।
দেশভাগ, শিকড় ও শৈশবের পাঠশালা
যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালে, বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার ডহরপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের দোর্দণ্ড প্রতাপ জমিদার। আড়াই হাজার বিঘা জমির অধীশ্বর ছিলেন প্রমথনাথ। তবে জমিদারির আভিজাত্য ও প্রতাপের আড়ালে ছিল শিল্পের প্রতি এক গভীর অনুরাগ। তিনি নিজে ছবি আঁকতেন, মূর্তি গড়তেন। মায়েরও আঁকার প্রতি গভীর টান ছিল। সেই পরিবেশেই যোগেনের প্রথম হাতেখড়ি। জমিদারির হিসাবের কাগজের উল্টো পিঠে আঁকিবুকি কাটতে কাটতেই শিশু যোগেনের ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল এক শিল্পী।
কলকাতার বাসায় দেয়ালে আঁকা একটি ময়ূর — এটিকেই তিনি নিজের জীবনের প্রথম চিত্রকর্ম বলে মনে করতেন। দুর্গা গড়তে আসা কুমোরের কাজ তিনি অপলক তাকিয়ে দেখতেন। কীভাবে খড়, তুষ, মাটির তাল একটু একটু করে চোখ, মুখ, আঙুল হয়ে ওঠে, কীভাবে রঙের প্রলেপে প্রাণ পায় মৃন্ময়ী মূর্তি — এই দেখাই তাঁর শিল্পবোধের প্রথম পাঠশালা।
দেশভাগ ছিল তাঁর জীবনে একটা বড়ো ছেদ। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর ১৯৪৮ সালেই তিনি একা চলে আসেন ভারতে। পরিবার স্থায়ীভাবে চলে আসে ১৯৫০ সালে। ১৯৫১ থেকে তাঁদের ঠিকানা হয় ঢাকুরিয়ার শহিদনগর কলোনি, যা ছিল উদ্বাস্তু জীবনের প্রতীক। সেই কলোনির, শরণার্থী শিবিরের উদ্বাস্তু নারী-পুরুষের বলিরেখা-ময় মুখ, যন্ত্রণা, ক্লান্তি — এই সবই তাঁর তুলিতে উঠে আসে পরবর্তীকালে।
শিক্ষা ও বিশ্ব-পরিক্রমা
১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর শিক্ষক তালিকা ছিল ঈর্ষণীয় — মানিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরেন ব্রহ্ম, দেবকুমার রায়চৌধুরী, অপর্ণা রায়, বরেন নিয়োগী, রথীন মৈত্র, সত্যেন ঘোষাল, হরেন দাস, গোপাল ঘোষ, কিশোরী রায়ের মতো দিকপালরা।
ডিগ্রির পর হাওড়ার একটি স্কুলে ও পরে হ্যান্ডলুম বোর্ডে কিছুদিন চাকরি করেন। কিন্তু তাঁর চোখ ছিল আরও দূরে। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে যান। সেখানে উইলিয়াম হ্যাটারের বিখ্যাত ‘আতেলিয়ের ১৭’ এবং ‘একোল নাসিওনাল সুপেরিয়র দে বোজ আর্ট’-এ কাজ করেন। এরপর তিন বছর ধরে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মিশরের জাদুঘর ও গ্যালারি ঘুরে দেখেন। এই বিশ্ব-পরিক্রমা তাঁর চিত্রভাষায় আনে আধুনিকতার নতুন মাত্রা।
১৯৬৮-এ দেশে ফিরে চেন্নাইয়ে টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন কিছুদিন। ১৯৭২ সালে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে কিউরেটর হিসেবে যোগ দেন। পরে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতেও এসেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শৈলী: যেখানে রেখা হয়ে ওঠে প্রতিবাদ
যোগেন চৌধুরীকে বলা হয় সমাজ-সচেতন শিল্পী। তাঁর বড় ভাই কলকাতার বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই সূত্রে বামপন্থী সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পচিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তিনি মানবমুক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
তাঁর ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য — হ্যাচিং ও ক্রস-হ্যাচিং। উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষের মুখের বলিরেখা ফোটাতে গিয়ে যে রেখার জাল বুনতে শুরু করেছিলেন, তাই পরে হয়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষর। জলরং, প্যাস্টেল, তেলরং বা শুধু কালি — যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, তাঁর রেখা কথা বলে। তাঁর প্রথম দিকের কাজে পিকাসোর প্রভাব স্পষ্ট, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্প আন্দোলনের এক আশ্চর্য সংশ্লেষ ঘটেছে তাঁর কাজে।
তিনি কখনও সুন্দরের স্তুতি করেননি শুধু। সমাজ ও রাজনীতির ভণ্ডামি, কদর্যতা, ক্ষমতার বিকারকে তিনি ব্যঙ্গচিত্রের মোড়কে তুলে ধরেছেন। তাঁর নারীরা সুন্দরী নন, বরং ক্লান্ত, বিদ্ধ, কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী। তাঁর পুরুষরা অনেক সময়ই কিম্ভূতকিমাকার, লোভী, প্রভুত্বকামী — এ যেন সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।
এক নীরব অথচ উচ্চকিত উত্তরাধিকার
যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণ শুধু একজন শিল্পীর চলে যাওয়া নয়, বলা যেতেই পারে “একটি যুগের অবসান”। প্রথাগত দিকের বাইরে বেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্প শুধু দেয়ালে ঝোলানোর বস্তু নয়, শিল্প হতে পারে প্রতিবাদের ভাষা, এমনকি সময়ের দলিল। দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা, কলকাতার মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি, রাজনীতির কদর্যতা — সবকিছুই তাঁর রেখায় স্থান পেয়েছে।
শিল্পী যোগেন চৌধুরীর শিকড় ছিল বাংলাদেশে, তবে বেড়ে ওঠা ও সৃষ্টি ছিল ভারতবর্ষে — এই দ্বৈততাই তাঁকে দিয়েছিল এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি। আজ যখন তাঁর বৈচিত্র্যময় তুলিটি নীরবে থেমে গেছে, তখন শিল্প সংস্কৃতির অমূল্য রহস্য নিয়ে জেগে আছে তাঁর অজস্র রেখা, যা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের শেখাবে কীভাবে নীরবে থেকেও উচ্চকণ্ঠে কথা বলা যায়, চোখে আঙুল দিয়ে প্রশ্ন করা যায় —- ” রাজা তোর কাপড় কোথায়?”
যোগেন চৌধুরীর তুলিতে রাজনীতি ছিল ব্যঙ্গের ভাষা। ১৯৭৪-এর ‘দ্য ইয়ুথ’-এর স্থূলকায় পুরুষ অবয়বে তিনি তৎকালীন সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে বিদ্ধ করেন। ২০১৯-২০ সালে CAA-NRC বিরোধী আন্দোলনে এসপ্ল্যানেডে তিনি কালো ক্যানভাসে ত্রিবর্ণ বর্ডারে খুলি এঁকে প্রশ্ন তোলেন, অশোক চক্রের জায়গা মৃত্যু নিল কি না। ২০০৫-এ আবু ঘ্রাইব নির্যাতন নিয়ে সিরিজ এবং বিলকিস বানো প্রসঙ্গে ‘কিলার অব দ্য প্রেগন্যান্ট ওম্যান’ ছিল রাষ্ট্রীয় হিংসার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ।