মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসার নজির আমরা অনেক শুনেছি, কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিচয়কে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এমন অভিনব জালিয়াতির কথা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন। ইতালির এক ব্যক্তি ঠিক এই কাজটিই করেছেন। প্রায় তিন বছর আগে মায়ের মৃত্যু হলেও সেই তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে গিয়ে প্রতি মাসে মায়ের নামে আসা পেনশনের টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। আর এই প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তা রীতিমতো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
কীভাবে চলত এই প্রতারণা?
ইতালির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির বয়স ৫৬ বছর। তাঁর মা ছিলেন একজন পেনশনভোগী। প্রায় তিন বছর আগে বার্ধক্যজনিত কারণে ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। নিয়ম অনুযায়ী, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর পরিবারের তরফে সরকারি দফতরে খবর দিয়ে পেনশন বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা। কিন্তু ছেলে তা করেননি।
উল্টে তিনি একটি পরিকল্পনা করেন। মায়ের মৃত্যুর খবর গোপন রাখলে প্রতি মাসে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ পেনশনের টাকা সরকার থেকে আসে, তা বন্ধ হবে না। সেই টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে ঢোকাতে পারলেই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। এই লোভ থেকেই শুরু হয় দীর্ঘদিনের প্রতারণা।
তবে শুধু খবর গোপন রাখলেই তো হবে না, কারণ পেনশনভোগীদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর সশরীরে হাজিরা দিতে হয় বা জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে হয়। এই বাধা টপকাতেই ওই ব্যক্তি এক অদ্ভুত সাজের আশ্রয় নেন।
অভিযোগ, যখনই সরকারি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হতো, তখনই তিনি নিজের মৃত মায়ের আলমারি থেকে শাড়ি বা গাউনের মতো পোশাক বের করে পরতেন। মাথায় পরতেন মহিলাদের পরচুলা, চোখে মোটা ফ্রেমের কালো সানগ্লাস, যাতে কেউ তাঁর আসল চেহারা চিনতে না পারে। এভাবেই মায়ের সাজে সেজে তিনি নিজেকে মা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারি দফতরে গিয়ে হাজিরা দিতেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সই করতেন।
তিন বছর ধরে কেউ ধরতে পারেনি
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই জালিয়াতি এক-দুই মাস নয়, টানা প্রায় তিন বছর ধরে চলেছে। প্রথম দিকে সরকারি কর্মীদের কেউই তাঁর এই ছদ্মবেশ ধরতে পারেননি। কারণ তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে মায়ের মতো হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি নকল করার চেষ্টা করতেন।
প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে মায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে পেনশনের টাকা তুলে নিতেন তিনি। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে গেছেন।
কীভাবে ফাঁস হলো রহস্য?
তবে কথায় আছে, অপরাধ কখনও চাপা থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তি একইভাবে আসছেন, তাঁর বয়স, তাঁর শারীরিক গঠন নিয়ে ধীরে ধীরে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে অফিসের কয়েকজন কর্মীর মনে।
বিশেষ করে, ওই ব্যক্তির গলার স্বর, হাতের গঠন এবং হাঁটার ধরন দেখে কয়েকজন কর্মীর মনে খটকা লাগে। তাঁরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপরই প্রশাসনের তরফে গোপনে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, যে মহিলার নামে পেনশন দেওয়া হচ্ছে, তাঁর মৃত্যু শংসাপত্র তিন বছর আগেই ইস্যু করা হয়েছে স্থানীয় পুরসভা থেকে। অর্থাৎ তিনি বহুদিন আগেই মারা গেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ তদন্তে নেমে ওই ৫৬ বছর বয়সী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রথমে তিনি অস্বীকার করলেও পরে সমস্ত ঘটনা স্বীকার করে নেন। পুলিশ তাঁর বাড়ি থেকে মৃত মায়ের পোশাক, পরচুলা এবং সানগ্লাস উদ্ধার করেছে বলে জানা গিয়েছে।
আইনি পদক্ষেপ এবং প্রতিক্রিয়া
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ইতালির প্রশাসনে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি নথি জালিয়াতি, পরিচয় প্রতারণা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো একাধিক গুরুতর ধারায় ফৌজদারি মামলা রুজু করা হয়েছে।
তবে তিনি এই তিন বছরে মোট কত টাকা পেনশন হিসেবে তুলেছেন, সেই অঙ্ক এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি। পুলিশ তাঁর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট খতিয়ে দেখছে। আদালতে এই মামলার শুনানি চলছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।
এই ঘটনা ইতালিতে পেনশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। কীভাবে একজন ব্যক্তি মৃত মানুষের বেশ ধরে তিন বছর ধরে প্রশাসনকে বোকা বানালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এরপর থেকে পেনশনভোগীদের জীবিত থাকার প্রমাণ যাচাই করার প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার কথা ভাবছে ইতালি সরকার।