পটাশপুরের গোপালপুরে ৩০০ বছরের চৌধুরী বাড়ির দুর্গোৎসব: রাজা-প্রজার ভেদ ভুলিয়ে আজও মিলনের মেলা
অলকেশ মাইতি, পটাশপুর: পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর এক নম্বর ব্লকের এক প্রান্তিক গ্রাম গোপালপুর। কেলেঘাই নদীর তীর ঘেঁষা এই গ্রামের নাম শুনলেই জেলার মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর কথা – গোপালপুরের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো। পরিবারের গণ্ডি থেকে এই পুজোর সূচনা হলেও, সেই শুরু থেকেই সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে । অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানা এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে চৌধুরী বাড়ির পূজা ব্যপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই পুজোকে কেন্দ্র করে যে আনন্দমেলা বসে, তা আজও রাজা-প্রজার ভেদাভেদ ভুলিয়ে সমগ্র এলাকার মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে।
পুজোর ইতিহাস: পট্টনায়েক থেকে চৌধুরী হয়ে ওঠার কাহিনী
প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও ইতিহাস গবেষক মন্মথনাথ দাসের লেখা ” পটাশপুরের সেকাল একাল” গ্রন্থ পড়ে জানতে পারি যে, চৌধুরী পরিবারের এই দুর্গাপুজো প্রায় তিনশত বছরের পুরনো । এই পূজার ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় তিনশো বছর। অনুমান করা হয়, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে এই পুজোর সূচনা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এই পরিবারের আদি পদবী ছিল পট্টনায়েক।
পরিবারের সদস্যা বিশিষ্ট লেখিকা কলি সাহু চৌধুরী জানান — “এক পূর্বপুরুষ হরিদাস পট্টনায়েক। তাঁর পুত্র ভগবান পট্টনায়েক এক বিশেষ কৃতিত্বের জন্য প্রথমে ‘দাস’ পদবী এবং পরবর্তীকালে ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত হন। ব্রিটিশ আমল বা তারও আগে স্থানীয় জমিদারি ব্যবস্থায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই উপাধি লাভ হয়েছিল বলে আমরা শুনে আসছি। সেই থেকেই পট্টনায়েক পরিবার চৌধুরী পরিবারে রূপান্তরিত হয় এবং এই পদবীই আজ পর্যন্ত আমরা বহন করে চলেছি।”
এই বংশেরই চতুর্থ পুরুষ নন্দলাল চৌধুরীর পুত্র আনন্দলাল চৌধুরী গোপালপুর গ্রামে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। কথিত আছে, সেই সময় গ্রামে দেবী আরাধনার কোনও বড় আয়োজন ছিল না। পারিবারিক সমৃদ্ধি এবং দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে আনন্দলাল চৌধুরী পারিবারিক দুর্গাপুজো শুরু করেন। সেই শুরু, আজ তিনশো বছর পরও একই নিষ্ঠা ও আড়ম্বরে চলছে।
চৌধুরী বাড়ির পুজোর বেশ কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা একে অন্যান্য পারিবারিক পুজো থেকে আলাদা করে।
১. প্রতিমা নির্মাণ ও কাঠামো: আজও এই বাড়িতে সনাতন বাংলা রীতিতে একচালা প্রতিমা তৈরি হয়। প্রতিমা তৈরির জন্য শুভ সূচনা হয় জন্মাষ্টমীর দিন। ওই দিন কেলেঘাই নদীর পাড় থেকে পবিত্র মাটি সংগ্রহ করে এনে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন মৃৎশিল্পী। আগে এই পুজো হতো মাটির তৈরি অস্থায়ী মন্ডপে, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মাটির মন্ডপ’ বলা হতো। কিন্তু কালের পরিবর্তনে এবং প্রতিমার সুরক্ষার কথা ভেবে কয়েক বছর হলো পাকা মন্ডপে পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। তবে মন্ডপ পাকা হলেও পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে আধুনিকতার কোনও ছোঁয়া এখনও পর্যন্ত লাগেনি বলে জানা যায়।
২. অলংকার ও আকার: এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দেবীর অলংকার এবং প্রতিমার বিশাল আকার। চৌধুরী বাড়ির দুর্গা প্রতিমা আকারে অত্যন্ত বড় এবং দেবীর অঙ্গে থাকে খাঁটি সোনার গয়না। বংশ পরম্পরায় এই গয়না দেবীর জন্যই সংরক্ষিত থাকে। সপ্তমীর সকালে যখন দেবীকে এই স্বর্ণালংকারে সাজানো হয়, তখন তাঁর রূপ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মানুষ ভিড় জমান।
৩. ভোগ ও প্রসাদ: চৌধুরী পরিবারের আতিথেয়তা সর্বজনবিদিত। পুজোর তিন দিন – সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী – প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের জন্য খিচুড়ি প্রসাদের আয়োজন করা হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল দর্শনার্থী একসাথে বসে এই প্রসাদ গ্রহণ করেন। এই ভোগই এই পুজোর মিলনক্ষেত্রের প্রধান প্রতীক।
এই পুজোর আচার-নিষ্ঠা কিন্তু আজও কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। প্রথা অনুযায়ী ষষ্ঠী ও সপ্তমীর ভোরে ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি সহকারে কেলেঘাই নদী থেকে জল ভরে ঘট তোলা হয়। এই ঘট তোলার মধ্য দিয়েই দেবীর মূল পুজোর সূচনা হয়। এই রীতি আজও অপরিবর্তিত আছে।
এই পুজোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য রীতি হলো হোম। আগে এই হোমে প্রায় ১০০ কেজি ঘি ব্যবহার করা হতো। সময়ের সাথে সাথে এবং ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে বর্তমানে প্রায় ৪০ কেজি ঘি দিয়ে হোম করা হয়। অষ্টমীর দিন এই হোমকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ মানত প্রথা আছে। বহু ভক্ত নিজেদের মনস্কামনা পূরণের জন্য ঘি মানত করেন। তারা অষ্টমীর দিন এসে নিজেদের সাধ্যমতো ঘি দান করেন। বিশ্বাস করা হয়, দেবীর হোমে ঘি দান করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়।
দশমীর দিন কেলেঘাই নদীর জলেই দেবীর নিরঞ্জন হয়। বিসর্জনের সেই শোভাযাত্রাও এক দেখার মতো বিষয়।
চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে মেলা বসে, তা পটাশপুরের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ মেলা। পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই মন্ডপের সামনের বিশাল মাঠে দোকানপাট বসতে শুরু করে।
এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক মুক্তমঞ্চ। কথিত আছে, এক সময় যখন সমাজে রাজা-প্রজার ভেদাভেদ প্রবল ছিল, তখন এই মেলাই সবাইকে এক করেছিল। জমিদার এবং প্রজা একসাথে এই মেলায় আনন্দ করতেন। সেই ঐতিহ্য আজও বজায় আছে।
মেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যাত্রা, কবিগান, মঙ্গলগান, বাউল গান – গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমস্ত অনুষ্ঠানই এখানে মঞ্চস্থ হয়। দূর-দূরান্ত থেকে যাত্রাদল আসে অভিনয় করতে। তাই পুজোর কয়েকটা দিন গোপালপুর যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।
আজও অটুট পারিবারিক বন্ধন:
এই পুজোর সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো পারিবারিক বন্ধন। এই পরিবারের সদস্যরা আজ কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। কিন্তু পুজোর আগেই তাঁরা সকলে বাড়ি ফিরে আসেন। সারা বছর ফাঁকা পড়ে থাকা চৌধুরী বাড়ি পুজোর কয়েকটা দিনে গমগম করে ওঠে।
এই পুজোর ব্যয়ভার বহন করা হয় দেবোত্তর সম্পত্তির আয় এবং পারিবারিক সদস্যদের সকলের সম্মিলিত সাহায্যে। কোনও একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় এই পুজো, এটি সকলের পুজো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি আর শুধু চৌধুরীদের পুজো নয়, এটি তাদের নিজেদের পুজো। কেলেঘাই নদীর পাড়ে যখন শরতের সাদা কাশফুল ফুটতে শুরু করে, তখনই গোপালপুর সহ আশপাশের সমস্ত গ্রামের মানুষ দেবীবরণের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। তাদের কাছে এই পুজো মানেই আবেগ, এই মেলা মানেই মিলন। তিনশো বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও একইভাবে অটুট, যা আগামী প্রজন্মের কাছেও এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। মানুষের ভালবাসা আর প্রত্যয়ের বন্ধনে চৌধুরী বাড়ির পূজার ইতিহাস আরও দীর্ঘ হবে।