নিজস্ব প্রতিবেদন, Muthokotha.in: পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর ১ ব্লকের হাট গোপালপুরের চৌধুরী পরিবারের মাটির গন্ধে মিশে থাকা জীবনের দীর্ঘ পথের রেখাকে হৃদয়ে ধারণ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছেন কলি সাহু চৌধুরী। তবে কিছু পথ আছে, যা শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায় না। সেই পথ পেরোতে হয় মন দিয়ে, অনুভব দিয়ে, স্মৃতির ভিতর দিয়ে। তেমনই এক পথের গল্প নিয়েই পাঠকের দরবারে আসছেন লেখিকা কলি সাহু চৌধুরী। ” দীঘলপত্র” প্রকাশনা থেকে তাঁর নতুন ভ্রমণ গ্রন্থ “কেদার বদ্রী থেকে মণিকর্ণিকা” প্রকাশিত হতে চলেছে আগামী শনিবার, মহালয়ার পুণ্য দিনে।
এই বইটি নিছক কোনো ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং লেখিকার দেখা, অনুভব করা এবং নিজের ভিতরে বহন করে চলা বহু মুহূর্তের এক সমষ্টি। এ প্রসঙ্গে লেখিকা তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন,
> “এই বই আমার কাছে শুধুই একটি ভ্রমণকাহিনি নয়। এটি আমার দেখা, অনুভব করা, উপলব্ধি করা এবং নিজের ভিতরে বহন করে চলা কিছু মুহূর্তের সমষ্টি।”
তিনি আরও জানিয়েছেন, পাহাড়ের নীরবতা থেকে তীর্থের জনসমুদ্র, দেবদর্শনের অনুভব থেকে মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে জীবনের গভীর প্রশ্ন— সব মিলিয়ে এই পথচলা তাঁর কাছে ধীরে ধীরে এক অন্তরযাত্রায় পরিণত হয়েছে।
লেখিকার জানিয়েছেন, এই যাত্রার বীজ বপন হয়েছিল ২০১৭ সালে। সেই বছর বদ্রীনাথজির দর্শন করে ফেরার পর থেকেই তাঁর মনে হয়েছিল এই অভিজ্ঞতাগুলোকে শব্দের মধ্যে ধরে রাখা প্রয়োজন। তখনই ফেসবুকের পাতায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু লেখা শুরু করেন তিনি। তবে তখনও তিনি ভাবেননি যে সেই বিচ্ছিন্ন অনুভূতিগুলোই একদিন একটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের রূপ নেবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লেখার পরিধি বাড়তে থাকে। লেখিকা জানান, ২০২৪ সালে কেদারনাথ ধামের দর্শন তাঁর লেখার ধারাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তাঁর ভাষায়, বদ্রীনাথের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হল কেদারের অভিজ্ঞতা, পাহাড়ের আরও এক রূপ, আরও কিছু মানুষ, আরও কিছু অনুভব। তাঁর মনে হয়েছে, এই যাত্রা শুধু স্থান পরিবর্তনের নয়, এ যেন নিজের ভিতরেরও এক নতুন পথচলা।
এরপর এই যাত্রায় যুক্ত হয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৪৪ বছরের মহাকুম্ভ। ২০২৫-এর প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভ মেলার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। তিনি লিখেছেন, মানুষের অগণিত ভিড়ের মধ্যেও যে এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভব থাকে, বিশ্বাসের যে কত রূপ, মানুষের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা যে কত বিচিত্র অথচ কতখানি এক— সেই অনুভব তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তাই এই অভিজ্ঞতা বইয়ের একটি পূর্ণ অধ্যায় হওয়ার দাবি রাখে। সেই থেকেই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে জায়গা পেয়েছে মহাকুম্ভের সেই অমৃত-অনুভব।
আর যাত্রার শেষ পরিণতি বারাণসীতে। কাশী বিশ্বনাথ, অন্নপূর্ণা মন্দির, মণিকর্ণিকা ঘাট, গঙ্গার তীর, বারাণসীর অলিগলি— সবকিছু যেন এই যাত্রাকে এক গভীর পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। লেখিকার কথায়,
> “সেখানে শুধু তীর্থ দেখিনি; দেখেছি মানুষকে, জীবনের নানা রূপকে, বিশ্বাসকে, মৃত্যু ও জীবনের পাশাপাশি চলাকে।”
কাশীর গলিপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর কখনও মনে হয়েছে, তিনি যেন বাইরের কোনও শহরের পথ নয়, নিজের ভিতরেরই কোনও অচেনা পথ অতিক্রম করছেন।
লেখিকা তাঁর বইটিকে চারটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন, যা তাঁর কাছে চারটি আলাদা ভ্রমণ নয়, বরং একই অন্তরযাত্রার চারটি স্তর।
প্রথম অধ্যায়— বদ্রীনাথ : শুরু হওয়ার গল্প। যেখানে ২০১৭ সালের সেই প্রথম উপলব্ধির সূচনা।
দ্বিতীয় অধ্যায়— কেদারনাথ : অনুভবের আরও গভীরে যাওয়া। যেখানে পাহাড়ের আরও এক রূপের সঙ্গে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
তৃতীয় অধ্যায়— মহাকুম্ভ : বিশ্বাস ও মানুষের মহাসমুদ্রের স্পর্শ। যেখানে কোটি মানুষের ভিড়ে একাকী বিশ্বাসের স্বরূপ খোঁজা।
এবং চতুর্থ অধ্যায়— বারাণসী : জীবন, মৃত্যু, বিশ্বাস ও আত্মঅন্বেষণের এক গভীর পরিণতি। যেখানে জীবন ও মৃত্যুর সহাবস্থান দেখে যাত্রা পূর্ণতা পায়।
লেখিকা জানিয়েছেন, এই চারটি অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে তিনি আসলে নিজেকেও একটু একটু করে খুঁজেছেন। লিখতে লিখতে তাঁর মনে হয়েছে, তিনি কোনো ভ্রমণের বিবরণ লিখছেন না, বরং তাঁর দেখা ভারতবর্ষকে লিখছেন।
বইটির পরিক্রমা প্রায় নয় বছরের। ২০১৭-তে যে অনুভূতির বীজটি মনে জন্মেছিল, তা ২০২৪-এর কেদারনাথ, ২০২৫-এর মহাকুম্ভ পেরিয়ে অবশেষে বারাণসীর ঘাটে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। লেখিকা জানিয়েছেন, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০২৬-এর জুন মাসে তিনি এই লেখার শেষ অধ্যায়টি সম্পূর্ণ করেন।
আজ সেই লেখা বই হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছচ্ছে। এই মুহূর্তটি তাঁর কাছে একদিকে যেমন গভীর আনন্দের, অন্যদিকে তেমনই আবেগেরও। কারণ এতদিন যে পথ তিনি নিজের মতো করে হেঁটেছেন, যে স্মৃতিগুলো ডায়েরির পাতায়, ফেসবুকের লেখায় কিংবা মনের গভীরে জমিয়ে রেখেছেন, আজ সেগুলিই প্রথমবার পাঠকের সামনে তুলে দিচ্ছেন।
> “আমি জানি না, এই বই পড়ে প্রত্যেক পাঠকের অনুভূতি কেমন হবে। তবে আমার একান্ত ইচ্ছে—এই বইয়ের পাতায় আপনারাও যেন কোথাও নিজের কোনও স্মৃতি খুঁজে পান।”
তাঁর আরও ইচ্ছে, পাঠক যেন বইয়ের পাতায় কোনও পাহাড়, কোনও মেঘ, কোনও মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, কোনও নদীর স্রোত, কোনও অচেনা মানুষের মুখ কিংবা নিজের জীবনের কোনও হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তের সঙ্গে হঠাৎ দেখা পান।
> “যদি এই বই পড়তে পড়তে একবারও মনে হয়— ‘এই পথ শুধু লেখিকার নয়, এ পথের কোথাও যেন আমারও একটি অংশ আছে,’ তাহলেই আমার এই লেখালেখি সার্থক হবে।”
সব মিলিয়ে “কেদার বদ্রী থেকে মণিকর্ণিকা” শুধু তীর্থযাত্রার বিবরণ নয়। এটি লেখিকার পথচলার স্মৃতি, তাঁর দেখা ভারতবর্ষের প্রতি ভালোবাসা এবং সর্বোপরি নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ অন্তরযাত্রা। মহালয়ার দিনে দেবীপক্ষের সূচনায় এই আত্ম-অন্বেষণের যাত্রায় পাঠককেও সঙ্গী হওয়ার আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন লেখিকা কলি সাহু চৌধুরী।