যন্তর মন্তর থেকে ঝাড়খণ্ড – অনশন, প্রতিবাদ আর বিতর্কে নেহা বোরার উত্থান
ভারতের ছাত্র রাজনীতির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত মুখ নেহা বোরা। উত্তরাখণ্ডের খাতিমা থেকে উঠে এসে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক থেকে নিখিল ভারত ছাত্র সমিতি বা AISA-র জাতীয় সভাপতি হওয়ার যাত্রায় তিনি এখন জাতীয় পরিসরে পরিচিত নাম। AISA ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত।
নেহা বোরার শৈশব কেটেছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় পরিবারকে একাধিক শহরে বদলি হতে হয়েছে। এই যাযাবর শৈশবই তাকে নানা সংস্কৃতি ও বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ছোটবেলা থেকেই নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর বক্তৃতা ও জনসংযোগ দক্ষতায় প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং পরে আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় দিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি JNU-র স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকস বিভাগে পিএইচডি করছেন। তাঁর গবেষণা পরিচালনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রহ্ম প্রকাশ।
২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত ছাত্র বিক্ষোভ নেহা বোরাকে সামনে আনে। এই আন্দোলন চলাকালীন জাতীয় মিডিয়া তাঁকে শিরোনামে নিয়ে আসে। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল দুটি – দেশজুড়ে বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET-এ অনিয়মের অভিযোগের সুরাহা। আন্দোলনকারীরা এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-এর পদত্যাগ চেয়েছিলেন এবং ভারত সরকার তাঁদের দাবি মেনে নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে শিক্ষা দপ্তর থেকে সরিয়েও দেয়।
অবশ্যই এই কাজটি খুব একটা সহজ ছিল না। কর্মসূচিকে আরও জোরালো করতে নেহা বোরা লাদাখের পরিবেশবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে টানা ২৩ দিনের অনশনে বসেন। এই দীর্ঘ অনশন তার শারীরিক অবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, অনশন শুরুর সময় তার ওজন ছিল প্রায় ৬৬ কিলোগ্রাম, যা ২৩ দিনের মাথায় সাড়ে ৭ কিলোগ্রামেরও বেশি কমে যায়। Free Press Journal-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে অনশনের শেষ পর্যায়ে তার রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শারীরিক অসুস্থতার কারণে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও নেহা বোরা তাঁর অনশন কর্মসূচি চালিয়েই যান। সেই সময় তিনি পুলিশি হেনস্তা ও ধরপাকড়ের অভিযোগও তোলেন।
নেহা বোরার রাজনৈতিক কৌশলের একটি ভিন্ন দিক উঠে এসেছে The Wire-এর একটি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে মজার মিম ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট হিসেবে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি অনলাইন প্রচারণা ধীরে ধীরে মাঠের ছাত্র আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। এই ডিজিটাল প্রচারণা থেকে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেহা বোরার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এটি দেখায় কিভাবে নতুন প্রজন্মের ছাত্রনেতারা সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
শুধু NEET বা প্রশ্নফাঁস নয়, নেহা বোরা একাধিক ইস্যুতে সরব হয়েছেন। ২০২৬ সালের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির সময় শিক্ষার্থী ও তরুণ বিক্ষোভকারীদের প্রতি দিল্লি পুলিশের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তিনি দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের অপসারণের দাবি তোলেন।
এছাড়া তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে –
১. শিক্ষার বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,
২. দেশজুড়ে গণপিটুনির ঘটনার বিরোধিতা,
৩. প্রশ্নপত্র ফাঁসের স্থায়ী সমাধানের দাবি,
৪. বিলকিস বানু মামলায় ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান,
৫. গাজায় চলমান মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ।
এই বহুমুখী অবস্থান তাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের নেতা থেকে বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরের কর্মী হিসেবে তুলে ধরেছে।
আন্দোলনের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঝাড়খণ্ডে একটি ছাত্র সমাবেশে যোগ দিতে গেলে নেহা বোরা আক্রমণের শিকার হন। ঝাড়খণ্ডে তাঁর ওপর কালি হামলা চালানো হয়। সেখানে এক ব্যক্তি তাঁর দিকে কালি ছুড়ে দেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ ওই ব্যক্তিকে আটক করে। হামলাকারী তাকে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেন এবং জেএনইউ-র প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদকে সমর্থন করার অভিযোগ তোলেন। এই ঘটনা ছাত্র রাজনীতিতে মতবিরোধ ও অসহিষ্ণুতার বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনে।
সেনা পরিবারের সন্তান থেকে থিয়েটার কর্মী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে JNU-র গবেষক এবং AISA-র জাতীয় সভাপতি – নেহা বোরার যাত্রা ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের একটি প্রতিচ্ছবি। প্রশ্নফাঁস, NEET অনিয়মের মতো শিক্ষা-কেন্দ্রিক দাবি থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিচিত করেছে। একই সঙ্গে তাঁর পথে এসেছে শারীরিক ঝুঁকি, পুলিশি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক আক্রমণও। আগামী দিনে তাঁর এই আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে এইভাবে অনেক প্রতিভাবান যুব মুখ রাজনীতির প্লাটফর্মে উঠে আসেন। কিন্তু বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতি রাজনৈতিক সময় চিত্রের মধ্যে এই প্রতিভাধর রাজনৈতিক সম্ভাবনারা হারিয়ে যাযয়। যেমনটা কানাইয়া কুমার একপ্রকার অন্তরালেই থেকে গেছেন।