কবিতা পাঠচক্রের ছিয়াশিতম ছকভাঙা আড্ডা: প্রান্তিক চেতনায় কবিতার ব্রতযাপন
গান্ধী জয়ন্তীর নির্মল দিবসে , সূর্যোদয়ের প্রভাতী কিরণে, ইতিহাসের অহিংস চেতনাকে স্মরণে রেখে পূর্ব মেদিনীপুরের মেছেদার ঐতিহ্যবাহী যোগেন্দ্র স্মৃতি সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কবিতা পাঠচক্রের ছিয়াশিতম ছকভাঙা বৈঠক। প্রাত্যহিকতার বাঁধা ছকের বাইরে বেরিয়ে এসে কবিতাকে যাপন করার যে নিরলস প্রয়াস, তারই আর এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হল এদিনের এই সম্মিলনে। কবিতার জন্য সারাদিন ধরে কবিদের প্রতীক্ষা এবং প্রত্যয়ের সার্থক রূপায়ণ ছিল এই প্রজন্মের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে অনুকরণীয় এক অধ্যায়!
অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক ভাষণে প্রবীণ সাহিত্যসাধক শিশিরকুমার বাগ তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে বলেন, “কবিতা পাঠচক্র মফস্বলের পরিসরে কবিতা অনুশীলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই যে চলমান পাঠশালা, এই যে নিরন্তর ঘুরে ঘুরে কবিতার পাঠ দেওয়া, তা নবীন প্রজন্মের আত্ম-উন্মোচনের এক অসাধারণ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। আমাদের এই জেলায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে সুদীর্ঘ গৌরবময় উত্তরাধিকার রয়েছে, তা আমাদের অহংকারের বিষয়। সেই পরম্পরাকে হৃদয়ে ধারণ করেই কবিতা চর্চার এই যজ্ঞ আরও বিস্তৃত হোক, আরও সুদূরপ্রসারী হোক। অক্ষরের আত্মীয়তায় গড়ে ওঠা এই বন্ধন আরও দৃঢ়, আরও গভীর এবং প্রাণবন্ত হোক।”
তাঁর এই আশাবাদী উচ্চারণের মধ্য দিয়েই আড্ডার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
কবিতা পাঠের প্রথম পর্যায়ে একে একে স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন শ্যামল রক্ষিত, গোবিন্দ বারিক, অমৃতা খেটো, আনন্দমোহন দাশ, সুজাতা বেরা এবং নিরঞ্জন মিশ্র। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় প্রান্তিক জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-প্রকৃতি ও সময়ের যন্ত্রণার নানা অনুষঙ্গ।
এই আড্ডার প্রধান স্থপতি ও সঞ্চালক কবি মনোতোষ আচার্য তাঁর বক্তব্যে এই আন্দোলনের দর্শনকে স্পষ্ট করে দেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “একাগ্রচিত্তে কবিতার সাধনার পরিধিকে প্রসারিত করতেই কবিতা পাঠচক্র অঙ্গীকারবদ্ধ। এই মেছেদার যোগেন্দ্র সভাগৃহেই কবি গৌতম ভট্টাচার্যের অভিভাবকত্বে ২০১৯ সালের ১০ই মার্চ আমাদের ১৬তম ছকভাঙা আসর বসেছিল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে আজ ৮৬তম আসরের আয়োজন করতে পেরে আমরা সত্যিই আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত। এই আত্মবিস্মৃত সময়ে, যখন চারিদিকে কেবল আত্মপ্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, তখন ছকভাঙা আড্ডা আত্মপ্রচারের বিপরীতে আত্ম-উদ্ভাসনের পথকেই বেছে নিয়েছে। এটাই আমাদের পথ, এটাই আমাদের অভিমুখ।”
দ্বিতীয় পর্বের কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন তরুণ ও প্রবীণ কবিদের এক উজ্জ্বল সমাহার – শুভম চক্রবর্তী, শচীদুলাল দাস, জয়দেব মাইতি, তনুশ্রী কর জানা, অনিমেষ মণ্ডল, দেবনাথ দে এবং পুষ্প সাঁতরা। তাঁদের পাঠেও আড্ডার প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে কবিতাময়।
এই আসরের একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রকাশনা উন্মোচন। এই মঞ্চেই কবি ও সম্পাদক সন্দীপন বেরা সম্পাদিত বহুল প্রচারিত সাহিত্য পত্রিকা ‘মেঘের বাড়ি’র অষ্টম বর্ষ শারদ সংখ্যা ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক আবরণ উন্মোচিত হয়। উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদের করতালি ও ‘সাধু সাধু’ উচ্চারণে মুখরিত হয় সেই মুহূর্ত।
তৃতীয় তথা অন্তিম পাঠপর্বে কবিতা পাঠ করেন অশোককুমার বাগ, রাখী সরদার, রবীন্দ্র সিংহ রায়, তাপস বৈদ্য, পৌলমী মিত্র, স্বপন বাগ এবং সন্দীপন বেরা স্বয়ং। একের পর এক কবিতা পাঠে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি এক অন্য মাত্রা লাভ করে, যা কবিতার নতুন ধারাকে পথ দেখাবার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করতে যথেষ্ট।
কেবল কবিতা পাঠই নয়, কবিতা নিয়ে গভীর মননশীল আলোচনাও এই আড্ডার প্রাণ। এবারের আড্ডায় ‘বিষয় ও রূপ: কবিতার একটি দ্বান্দ্বিক আলোচনা’ শীর্ষক বিষয়ে অত্যন্ত প্রজ্ঞাময় ও বিদগ্ধ বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক গৌতম ভট্টাচার্য। তাঁর বিশ্লেষণে কবিতার আঙ্গিক ও আত্মার দ্বন্দ্ব এবং সমন্বয়ের যে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উঠে আসে, তা উপস্থিত শ্রোতাদের ঋদ্ধ করে।
সমগ্র অনুষ্ঠান জুড়ে তাঁর সুললিত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করে আড্ডার আবহকে আরও মনোরম করে তোলেন সংগীতশিল্পী তপতী দাশ আচার্য। সম্পর্কে তিনি কবি মনোতোষ আচার্যের সহধর্মিনী হলেও, সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিমলকুমার দাস এবং কবি অশোককুমার বাগ।
এদিনের আড্ডার আহ্বায়ক, তরুণ অক্ষরকর্মী সন্দীপন বেরা তাঁর সমাপ্তি ভাষণে বলেন, “প্রচলিত কবিতা চর্চার গতানুগতিক ধারা থেকে কবিতা পাঠচক্রের ছকভাঙা আড্ডার পথ সম্পূর্ণ আলাদা। সুদীর্ঘ এগারো বছর ধরে প্রান্তিক বাংলায় এই চর্চা এক নীরব সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে কাজ করে চলেছে। লিটল ম্যাগাজিনের নবীন কবিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে কবিতা পাঠচক্র যে ভূমিকা পালন করে চলেছে, তার সঙ্গে আমরা যুক্ত থাকতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। আজকের এই আড্ডায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ঊনত্রিশ জন কবিতানুরাগী মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। কবিতা পাঠচক্রের এই ছকভাঙা আড্ডা কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান নয়, এটি আসলে একটি ব্রত, একটি নিরন্তর সাধনার উদযাপন।”
গান্ধীজয়ন্তীর সারাদিবসে কবিতা, গান ও মননশীল আলোচনার এক অপূর্ব সমন্বয়ে শেষ হয় ছিয়াশিতম ছকভাঙা আড্ডা। উপস্থিত সকলেই একরাশ কাব্যিক প্রেরণা নিয়ে ঘরে ফেরেন, আবারও নতুন কোনো প্রান্তে, নতুন কোনো ছকের বাইরে কবিতার জন্য মিলিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।