বিজ্ঞান মঞ্চের বিজ্ঞান অভীক্ষায় অভূতপূর্ব সাড়া এগরায়, ৬ ভেন্যুতে পরীক্ষা দিল ২০২৩ জন
নিজস্ব সংবাদদাতা, এগরা, পূর্ব মেদিনীপুর: মুখস্থ বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রকৃত বিজ্ঞান চেতনা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং যুক্তিবাদী মন গড়ে তুলতে প্রতি বছরের মতো এবারও রাজ্যজুড়ে বিজ্ঞান অভীক্ষার আয়োজন করল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গণবিজ্ঞান সংগঠনটি গত প্রায় চার দশক ধরে নিরলসভাবে কুসংস্কার ও অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এই বিজ্ঞান অভীক্ষা।
এই পরীক্ষা কোনো গতানুগতিক স্কুলের পরীক্ষা নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ভাবতে শেখানো। বর্তমান সময়ে যখন সমাজের একাংশে নানা ধরনের অপবিজ্ঞান, ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন এই অভীক্ষা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন শিক্ষকমহল ও অভিভাবকরা।
এবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরায় এই অভীক্ষাকে ঘিরে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। উদ্যোক্তাদের দাবি অনুযায়ী, এবার এগরায় অভূতপূর্ব সাড়া পড়েছে। এগরা বিজ্ঞান কেন্দ্রের অধীনে এবার মোট ৬টি ভেন্যুতে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর মধ্যে এগরা ঝাটুলাল হাইস্কুল ছিল প্রধান কেন্দ্র। অন্যান্য কেন্দ্রগুলিতেও সকাল থেকেই বিজ্ঞানকর্মীদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো।
জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এবারের অভীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত কয়েক হাজার খুদে পড়ুয়ার উপস্থিতিতে গমগম করছিল প্রতিটি কেন্দ্র। ৬টি কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০২৩ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র এগরা কেন্দ্রেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১০৩৩ জন, যা রীতিমতো রেকর্ড।
এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরনও ছিল একেবারে আলাদা। সরাসরি পাঠ্যবই থেকে প্রশ্ন তুলে দেওয়ার প্রবণতা এখানে নেই। বরং দৈনন্দিন জীবনের আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা, গণিতের ধাঁধা, হাতেকলমে পরীক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা এবং যুক্তিনির্ভর প্রশ্নের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা মুখস্থ না করে বুঝে উত্তর দিতে শেখে।
এই বিষয়ে এগরা কেন্দ্রের অভীক্ষা নিয়ামক তপন মহাপাত্র বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা নেওয়া নয়। আমরা চাই বিজ্ঞানটা ওদের জীবনের অংশ হয়ে উঠুক। শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, অভিভাবকদের মধ্যেও বিজ্ঞান সচেতনতা বাড়াতে আমরা এবার হরিপদ শাসমল স্মৃতি মঞ্চে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী বিষয়ক একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছি। অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের উৎসাহিত করেছে।”
অন্যদিকে বিজ্ঞানকর্মী নবেন্দু নায়ক জানান, “এগরা কেন্দ্রটিই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো অভীক্ষা কেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। এটা প্রমাণ করে যে মানুষ এখনও বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখে এবং তাদের সন্তানদের বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে চায়।”
প্রতিটি কেন্দ্রের মতো এদিন এগরাতেও বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের স্টল বসানো হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন বিজ্ঞান লেখকের বই, যুক্তিবাদী আন্দোলনের বই এবং ছোটোদের জন্য মজার বিজ্ঞানের বই বিক্রির ব্যবস্থা ছিল। অনেক আগ্রহী অভিভাবককেই বুক স্টল থেকে বই কিনতে দেখা যায়। ছোটোদের হাতে বিজ্ঞানের বই তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর জেলা ও রাজ্য স্তরে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপকদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে। শুধু পুরস্কারই নয়, তাদের নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞান শিবির ও কর্মশালারও আয়োজন করা হবে।
সব মিলিয়ে এগরার এই বিজ্ঞান অভীক্ষা আবারও প্রমাণ করল যে, সঠিক পথ দেখালে আজকের প্রজন্ম বিজ্ঞানকেই আঁকড়ে ধরতে চায়।