কলকাতার সাংস্কৃতিক আঙিনায় সম্মানিত হলেন দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা
নিজস্ব প্রতিবেদন, http://Muthokotha.in | কলকাতা : ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোকনৃত্য ও সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও প্রসারে ধারাবাহিক ভাবে কাজ করে চলা কলকাতার অন্যতম সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান হলো তাপস কুমার পাল একাডেমি অফ মিউজিক এন্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন (Tapas Kumar Pal Academy of Music and Cultural Foundation)। দক্ষিণ কলকাতার কসবা অঞ্চলের বোসপুকুর রোডে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক চর্চার একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, নিয়মিত কর্মশালা, সঙ্গীত সন্ধ্যা এবং গুণী শিল্পীদের সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে এই ফাউন্ডেশন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেই সম্প্রতি ২০২৬ বর্ষে দেশ ও বিদেশের পাঁচজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে তাঁদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অবদান ও সাধনার জন্য বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এই সম্মাননা শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলার লোকঐতিহ্য থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রচার পর্যন্ত এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক যোগসূত্রকে তুলে ধরে।
কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ‘তাপস কুমার পাল একাডেমি অফ মিউজিক এন্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন’ । এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়াসেই কলকাতা আজও ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে নিজের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
২০২৬-এ সম্মানিত হলেন শিল্প সংস্কৃতি জগতের ৫ জন প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।
১. নরেশ ব্যানার্জী– ঢালি নৃত্যশিল্পী ও ব্রতচারী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। নরেশ ভট্টাচার্য জন্মগ্রহণ করেন ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে। তিনি বাংলার প্রবাদপ্রতিম ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত একজন বিশিষ্ট সাধক ও কর্মী। গুরুসদয় দত্ত প্রবর্তিত ব্রতচারী আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মশক্তি, শৃঙ্খলা এবং শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষের আন্দোলন। নরেশবাবু সেই আন্দোলনের ধারাকে আজও বহন করে চলেছেন। বিশেষ করে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধনৃত্য ‘ঢালি’ নৃত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢালি নৃত্য শুধু একটি নৃত্য নয়, এটি বাংলার প্রাচীন রণকৌশল ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। তাঁর পরিবেশনা এবং শিক্ষাদানের মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই লুপ্তপ্রায় শিল্পকে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁর এই টেকসই প্রতিশ্রুতি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
২. রনি প্রেন্টিস রায় (কানাডা) – কণ্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও শিক্ষাবিদ। কানাডার গ্রেটার টরন্টো এলাকায় বসবাসকারী রনি প্রেন্টিস রায় জন্মগ্রহণ করেন ১ জানুয়ারি ১৯৫২ সালে। তিনি একজন কানাডীয়-বাঙালি কণ্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘রাগ রং মিউজিক একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা। এই একাডেমির মাধ্যমে তিনি সুদূর কানাডায় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা, প্রচার ও প্রসারে নিরলস কাজ করে চলেছেন। বহু প্রবাসী বাঙালি ও ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী তাঁর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিচ্ছেন। তিনি ‘পরম্পরা কানাডা’ এবং ‘সিটি অফ টরন্টো’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিখ্যাত ‘মর্নিং রাগ’ (Morning Raga) উৎসবের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এছাড়াও আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর অবদান রয়েছে। ভারতীয় ও বাঙালি সঙ্গীত ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক প্রচার ও সংরক্ষণে তাঁর এই অসামান্য ভূমিকার জন্যই ফাউন্ডেশন তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করছে।
৩. ড. পুষ্পা সত্যশীল (দিল্লি) – শিক্ষাবিদ, সঙ্গীততত্ত্ববিদ, বেহালা বাদক এবং হিন্দি কবি। বাস্তবিক এক বহুমুখী প্রতিভার নাম ড. পুষ্পা সত্যশীল। জন্ম ২৮ অক্টোবর ১৯৪০ সালে। তাঁর জ্ঞানের পরিধি অর্থনীতি থেকে সঙ্গীততত্ত্ব, পরিবেশন কলা থেকে হিন্দি সাহিত্য পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে খাইরাগড়ের বিখ্যাত ইন্দিরা কলা সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ও বেহালায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিক অ্যান্ড ফাইন আর্টস ফ্যাকাল্টি থেকে তিনি উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র বেহালার বিকাশ ও অভিযোজন নিয়ে তাঁর গবেষণা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর লেখা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই হলো ‘Journey of Violin from West to East’ এবং হিন্দি ভাষায় লেখা ‘Vāyolin kī Vikās Yātrā – Paścim se Pūrv’। একজন দক্ষ হিন্দি কবি ও লেখিকা হিসেবে তাঁর ১৯টিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে, যা সাহিত্য, কবিতা ও সঙ্গীত গবেষণার এক অমূল্য ভাণ্ডার।
৪. বিদুষী ডালিয়া রাহত – হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গ ও উপ-উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী । ভারতের অন্যতম সম্মানিত কণ্ঠশিল্পী বিদুষী ডালিয়া রাহত। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১২ এপ্রিল ১৯৪৯ সালে। তিনি বিশেষ করে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘পুরব অঙ্গ’ (Purab Ang) ধারায় তাঁর অসামান্য দক্ষতার জন্য সুপরিচিত। তাঁর কণ্ঠে ঠুমরি, দাদরা, চৈতি, কাজরি এবং টপ্পা এক অন্য মাত্রা পায়। তিনি কিংবদন্তি শিল্পী পদ্মভূষণ বিদুষী গিরিজা দেবীর অন্যতম বিশিষ্ট শিষ্যা এবং বেনারস ঘরানার সঙ্গীত ঐতিহ্যকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছেন। তিনি আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (ITC SRA), কলকাতার প্রথম ব্যাচের স্কলার ছিলেন, যা তাঁর সঙ্গীত জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘গিরিজাশঙ্কর পুরস্কার’ প্রদান করে।
৫. পণ্ডিত হরশঙ্কর ভট্টাচার্য, প্রখ্যাত সেতার বাদক। ৬ অক্টোবর ১৯৫০ সালে তাঁর জন্ম। পণ্ডিত হরশঙ্কর ভট্টাচার্য ভারতের একজন সফল এবং গুণী সেতার শিল্পী। তিনি সেতার বাদনের অত্যন্ত কঠিন ও মাধুর্যপূর্ণ ‘জাফরখানি বাজ’ (Jafferkhani Baaj) ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয় তাঁর বাবা প্রয়াত গঙ্গাশঙ্কর ভট্টাচার্যের কাছে। পরবর্তীতে তিনি বিষ্ণুপুর ঘরানার পণ্ডিত মুরলীধর ঠাকুরের কাছে তালিম নেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মুম্বাইতে গিয়ে কিংবদন্তি ওস্তাদ আব্দুল হালিম জাফর খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর কাছ থেকেই জাফরখানি বাজের সূক্ষ্ম কৌশল আয়ত্ত করেন। কর্মজীবনে তিনি দিল্লির শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR) এবং দূরদর্শনের ‘A-TOP’ গ্রেড শিল্পী এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিষদ (ICCR)-এর তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
ফাউন্ডেশনের কর্ণধার তাপস কুমার পাল Muthokotha.inকে জানিয়েছেন-— “এই সম্মাননার মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মকে এই সমস্ত গুণী শিল্পীদের সাধনা ও জীবন সম্পর্কে জানানো এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও লোকঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলা।” তিনি আরও বলেন, “সংস্কৃতি টিকিয়ে থাকে চর্চার মাধ্যমে, আর চর্চা বাঁচে সম্মানের মাধ্যমে।”