জনতার ক্ষোভের নামে ডিম, কালি বা অন্য জিনিস ছুড়ে হেনস্তা এবং অভিযুক্তকে হাতকড়া-দড়ি বেঁধে রাস্তায় হাঁটানো রুখতে এবার কড়া পদক্ষেপ করল কলকাতা হাইকোর্ট। একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যের ডিজিপিকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে। সেই নীতিমালা রাজ্যের প্রতিটি থানায় পৌঁছে দিতেও বলা হয়েছে।
আদালত কী জানতে চাইল?:–
হাইকোর্ট ২ সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে হলফনামা দিয়ে জানাতে বলেছে:
১. এখন পর্যন্ত ডিম ছোড়ার কতগুলি ঘটনা ঘটেছে।
২. অভিযুক্তকে হাতকড়া পরানো, কোমরে দড়ি বেঁধে হাঁটানো বা বুলডোজার দিয়ে সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো কতগুলি ঘটনা ঘটেছে।
৩. এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে রাজ্য সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে।
৪. ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে কী গাইডলাইন তৈরি করা হচ্ছে।
বেঞ্চের কড়া পর্যবেক্ষণ:–
শুনানিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বলেন, “শুধু এক-দুজনকে গ্রেফতার করলেই হবে না। মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সরকার কী পদক্ষেপ করেছে, তা স্পষ্ট করে জানান।” বিচারপতি পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, “প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজ্যের দায়িত্ব। কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না।”
রাজ্যের বক্তব্য:–
রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে জানান, “আমরা বারবার বলেছি, কেউ আইন নিজের হাতে তুলবেন না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না এলে পুলিশ কীভাবে ব্যবস্থা নেবে?”
মামলাকারীর অভিযোগ:–
মামলাকারীর আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, “পুলিশের সামনেই এ সব ঘটনা ঘটছে। পুলিশ নিজেই মব লিঞ্চিং-এ মদত দিচ্ছে। বিমানবন্দরের মতো সুরক্ষিত জায়গাতেও হামলা হচ্ছে। সাংসদরা বেরোতে পারছেন না। রাজ্যের একজন মন্ত্রী পর্যন্ত প্রকাশ্যে ডিম ছুড়তে বলছেন। সরকার নীরব কেন?” তিনি নাম না করে দিল্লি থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে এক সাংসদকে ঘিরে ধস্তাধস্তির ঘটনার উল্লেখ করেন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবিলম্বে অন্তর্বর্তী নির্দেশেরও আর্জি জানান। জবাবে বেঞ্চ জানায়, আপাতত রাজ্যের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট নেওয়া হচ্ছে। তার পর পরবর্তী নির্দেশ দেওয়া হবে।
আদালতের নির্দেশের মূল অংশ:–
১. ডিম ছোড়া, অভিযুক্তকে হাতকড়া-দড়ি পরিয়ে হাঁটানো বন্ধে রাজ্যের ডিজিপিকে গাইডলাইন তৈরি করতে হবে।
২. সেই গাইডলাইন রাজ্যের সব থানায় পাঠাতে হবে।
৩. কতগুলি এমন ঘটনা ঘটেছে, তার পরিসংখ্যান-সহ ২ সপ্তাহে হলফনামা দিতে হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট:–
সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ‘জনরোষ’ দেখিয়ে অভিযুক্ত বা বিরোধী নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম, কালি ছোড়া, রাস্তায় হাতকড়া পরিয়ে হাঁটানো, এমনকি বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভাঙার অভিযোগ উঠেছে। এতে আইনের শাসন ভেঙে পড়ছে দাবি করে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। সেই মামলাতেই এদিন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল ডিভিশন বেঞ্চ।
পরবর্তী শুনানি দু’সপ্তাহ পর। রাজ্যের রিপোর্টের উপরেই নির্ভর করছে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ।