নার্সের বদলে ওয়ার্ড বয় : স্যালাইন খুলতে গিয়ে কাঁচির কোপে কাটল আড়াই মাসের শিশুর আঙুল! ক্ষোভে ফেটে পড়ল পরিবার
চাঁচল, মালদা: ফের প্রশ্নের মুখে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা। নার্সের অনুপস্থিতিতে স্যালাইনের চ্যানেল খুলতে গিয়ে কাঁচির আঘাতে আড়াই মাসের এক শিশুর আঙুল কেটে ফেলার অভিযোগ উঠল ওয়ার্ড বয়ের বিরুদ্ধে। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে মালদার চাঁচল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের শিশু বিভাগে। ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল চত্বরে চরম উত্তেজনা। চিকিৎসায় চূড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখিয়েছে শিশুটির পরিবার।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত রবিবার চাঁচল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় চাঁচল ২ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা আড়াই মাসের শিশুপুত্র সায়ন মণ্ডলকে। সোমবার রাতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় চিকিৎসক স্যালাইন বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
পরিবারের অভিযোগ, সেই সময় ওয়ার্ডে কোনও নার্স ছিলেন না। ডিউটিতে থাকা ওয়ার্ড বয় সনাতন দাস নিজেই স্যালাইনের চ্যানেল খুলতে যান। লিউকোপ্লাস্ট কাটার জন্য তিনি কাঁচি ব্যবহার করেন। তাড়াহুড়োয় শিশুটির বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের ডগার অনেকটা অংশ কাঁচিতে কেটে যায়। মুহূর্তে রক্তে ভেসে যায় বিছানা। শিশুর চিৎকারে ছুটে আসেন অন্য রোগীর পরিজনেরা।
রক্তাক্ত শিশু, কান্নায় ভেঙে পড়ল মা
শিশুটির মা পূর্ণিমা মণ্ডল কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “নার্সদিদিকে ডাকতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি ছেলের আঙুল দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। ওয়ার্ড বয় কাঁচি হাতে দাঁড়িয়ে। আমার ছোট্ট ছেলেটার আঙুলটাই কেটে দিল। ও কি আর স্বাভাবিক হবে?”
ঘটনার পর তড়িঘড়ি শিশুটিকে ড্রেসিং করে মালদা মেডিক্যাল কলেজে রেফার করে চাঁচল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেখানে শিশু সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা চলছে সায়নের। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আঙুলের হাড় পর্যন্ত কেটে গিয়েছে। প্লাস্টিক সার্জারি লাগতে পারে।
ক্ষোভে ফেটে পড়ল পরিবার, ঘেরাও হাসপাতাল
ঘটনার খবর ছড়াতেই মঙ্গলবার সকাল থেকে হাসপাতালের সুপারের ঘরের সামনে বিক্ষোভ দেখান রোগীর আত্মীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, “নার্স-ডাক্তারের কাজ ওয়ার্ড বয় কেন করবে? রাতে ওয়ার্ড ফাঁকা থাকে। এটা খুনের চেষ্টা। দোষীর কঠোর শাস্তি চাই।” পরিস্থিতি সামাল দিতে চাঁচল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
চাঁচল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপার ডাঃ সুব্রত মণ্ডল বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। অভিযুক্ত ওয়ার্ড বয়কে শোকজ করা হয়েছে। কর্তব্যরত নার্স কেন ওয়ার্ডে ছিলেন না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতি প্রমাণ হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুটির চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব হাসপাতাল নেবে।”
স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিক্রিয়া
জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জানিয়েছেন, “রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। নার্সের কাজ ওয়ার্ড বয়কে দিয়ে করানো বেআইনি। কার নির্দেশে এমনটা হল, তদন্ত করে দেখা হবে। দোষীদের ছাড়া হবে না।”
বারবার প্রশ্নের মুখে পরিষেবা
এর আগেও চাঁচল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে প্রসূতি মৃত্যু, ভুল ইনজেকশন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পর্যাপ্ত নার্স-চিকিৎসক নেই। রাতে ওয়ার্ড কার্যত ওয়ার্ড বয়-আয়াদের ভরসায় চলে। এই ঘটনা ফের সেই অভিযোগকেই সামনে আনল।
আড়াই মাসের সায়নের আঙুল জোড়া লাগবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু এক রাতের গাফিলতি তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব এলাকাবাসী।