__প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশ্বের প্রাচীনতম শল্যচিকিৎসা প্রতিষ্ঠান স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের ‘রয়্যাল কলেজ অফ সার্জেনস’-এ স্থাপিত হল বিশ্বের প্রথম শল্যচিকিৎসক মহর্ষি সুশ্রুতের ব্রোঞ্জের মূর্তি। ‘প্লাস্টিক সার্জারির পিতা’ হিসেবে পরিচিত সুশ্রুতের এই মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে জগৎসভায় ভারতের প্রাচীন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বই ফের প্রমাণিত হল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক ) চলুন এবার জেনে নিই , কে এই মহর্ষি সুশ্রুত ?
_খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে মহর্ষি সুশ্রুত কাশীতে জীবিত ছিলেন বলে মনে করা হয় । তাঁর রচিত ‘সুশ্রুত সংহিতা’ শল্যচিকিৎসার আদি গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ৩০০ রকমের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, ১২০টি অস্ত্রের বর্ণনা, ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো, মূত্রাশয়ের পাথর অপসারণ, ছানি কাটা এবং প্লাস্টিক সার্জারির বিশদ বিবরণ আছে। বিশেষ করে ‘নাসা-সন্ধান’ অর্থাৎ কপালের চামড়া দিয়ে কাটা নাক জোড়া লাগানোর যে পদ্ধতি তিনি লিখেছিলেন, তাই আজকের ‘ইন্ডিয়ান রাইনোপ্লাস্টি’র ভিত্তি। এজন্যই তাঁকে ‘ফাদার অফ প্লাস্টিক সার্জারি’ বলা হয়।
খ ) এবার চলুন বিদেশভূমিতে কীভাবে বসল এই মূর্তি?
_মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটেনের খ্যাতনামা সার্জন অধ্যাপক চন্দ্র চেরুভু। তাঁর প্রচেষ্টাতেই রয়্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ সুশ্রুতের মূর্তি বসাতে রাজি হয়। প্রায় ৯০ কেজি ওজনের ব্রোঞ্জের এই মূর্তিটি তৈরি করেছেন তামিলনাড়ুর দক্ষ ভাস্কররা। মূর্তিতে সুশ্রুতকে প্রাচীন ভারতীয় পোশাকে শল্য-যন্ত্র হাতে দেখানো হয়েছে।
_অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রয়্যাল কলেজের প্রেসিডেন্ট, ফেলো এবং ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিরা। অধ্যাপক চেরুভু বলেন, “আধুনিক সার্জারির ভিত্তি যাঁরা তৈরি করেছেন, তাঁদের মধ্যে সুশ্রুত অন্যতম। তাঁর অবদানকে সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। নতুন প্রজন্মের সার্জনরা জানুক, ২৬০০ বছর আগেও ভারতে কত উন্নত শল্যচিকিৎসা হত।”
গ ) এই বিষয়ে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া কী ?
_স্কটল্যান্ডের ভারতীয় দূতাবাস এক্স হ্যান্ডলে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা লিখেছে, “এই অনুষ্ঠানে ভারতের প্রাচীন চিকিৎসা-ঐতিহ্য এবং চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে ভারত ও স্কটল্যান্ডের ঐতিহাসিক সম্পর্কের উদযাপন করা হয়। বিশ্বজুড়ে শল্যচিকিৎসা শিক্ষার প্রসারে রয়্যাল কলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সুশ্রুতের মূর্তি সেই সেতুবন্ধনকে আরও মজবুত করবে।”
ঘ ) কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতি ?
_১. ঐতিহাসিক স্বীকৃতি : ১৫০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল কলেজ অফ সার্জেনস অফ এডিনবার্গ বিশ্বের প্রাচীনতম সার্জিক্যাল কলেজ। সেখানে হিপোক্রেটিস, গ্যালেনের পাশে সুশ্রুতের মূর্তি বসা মানে পশ্চিমি বিশ্বও মেনে নিল যে আধুনিক সার্জারির শিকড় ভারতে।
২. সাংস্কৃতিক কূটনীতি : আয়ুর্বেদ ও ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি বড় পদক্ষেপ।
৩. নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা : বিশ্বের নানা দেশ থেকে সার্জারি পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীরা এবার থেকে সুশ্রুতের অবদান সম্পর্কে জানবে।
ঙ ) এবার প্রেক্ষাপটটা কী জানার চেষ্টা করি:
_এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের রয়্যাল অস্ট্রালেশিয়ান কলেজ অফ সার্জেনসেও সুশ্রুতের আবক্ষ মূর্তি বসেছে। কিন্তু এডিনবার্গের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই কলেজ থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় বহু সার্জন ভারতে এসেছিলেন এবং ‘সুশ্রুত সংহিতা’ পড়ে ভারতীয় প্লাস্টিক সার্জারির কৌশল শিখে ইউরোপে নিয়ে যান।
“যদি ভারতবর্ষকে জানতে চাও, তবে সুশ্রুতকে পড়ো”—এই উক্তিই ফের প্রমাণ হল এডিনবার্গে। ২৬০০ বছর আগে যে মনীষী যন্ত্রপাতি বানিয়ে, অ্যানাটমি শিখিয়ে শল্যচিকিৎসার পথ দেখিয়েছিলেন, আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা সার্জিক্যাল প্রতিষ্ঠানে তাঁর মূর্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলছে—জগৎসভায় ভারতই শ্রেষ্ঠ।