_“স্যার, মাত্র ৫ মিনিট… একটু দয়া করুন। আমার মেয়ের একটা বছর নষ্ট হয়ে যাবে।” মধ্যপ্রদেশের ভোপালের একটি নিট পরীক্ষা কেন্দ্রের গেটের সামনে কাতর আর্তি এক বাবার। কিন্তু নিয়মের বেড়াজাল টপকাতে পারল না মানবিকতা। মেয়েকে ঢুকতে না দেওয়ায় উত্তেজনা, উদ্বেগে সংজ্ঞা হারিয়ে গেটের সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বাবা। পাশে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকল মেয়েটি।
_ঘটনাটি মধ্যপ্রদেশের একটি নিট ইউজি পরীক্ষা কেন্দ্রের। রবিবার সকাল। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে গেট বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মেয়েটি গেটে পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪-৫ মিনিট পর।
_সঙ্গে ছিলেন বাবা। গেট বন্ধ দেখে তিনি নিরাপত্তারক্ষী ও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের কাছে বারবার কাকুতি-মিনতি করেন। “সারা বছর ধরে মেয়েটা প্রস্তুতি নিয়েছে। রাত জেগে পড়েছে। একটু দেরি হয়েছে রাস্তায় জ্যামের জন্য। একবারটি ঢুকতে দিন”—বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি।
_কিন্তু কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, NTA-র স্পষ্ট নির্দেশিকা আছে। নির্ধারিত সময়ের পর একজনকেও ঢুকতে দেওয়া যাবে না। এর ব্যতিক্রম হলে পুরো কেন্দ্রের পরীক্ষা বাতিল হয়ে যেতে পারে।
_বারবার অনুরোধ করেও লাভ না হওয়ায় বাবা ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আপনারা বুঝতে পারছেন না, ওর জীবনের প্রশ্ন।” এরপরই হঠাৎ তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রের গেটের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
_এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। ১৭-১৮ বছরের মেয়েটি “বাবা, ও বাবা” বলে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। আশপাশের অভিভাবকরা ছুটে এসে জল দেন, বাতাস করেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে বাবার। কিন্তু ততক্ষণে পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। নিয়মের কারণে মেয়েটিকে আর ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
_ঘটনার ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। একপক্ষের দাবি, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর জন্য যে নিয়ম, তা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। একজনের জন্য নিয়ম ভাঙলে গোটা সিস্টেম ভেঙে পড়বে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতেই এই কড়াকড়ি।
_অন্যপক্ষের প্রশ্ন, “নিয়ম কি মানুষের জন্য, না মানুষ নিয়মের জন্য?” মাত্র ৪-৫ মিনিটের জন্য একটা মেয়ের একটা বছর, একটা স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে? রাস্তায় যানজট, গাড়ি খারাপ, শারীরিক অসুস্থতা—যেকোনো কারণেই তো কয়েক মিনিট দেরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কি মানবিকতার খাতিরে ২-৩ মিনিট ছাড় দেওয়া যায় না? বিশেষ করে যখন পরীক্ষার্থী গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে, কাঁদছে।
_NTA-র গাইডলাইন অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর ২ ঘণ্টা আগে রিপোর্টিং টাইম শুরু হয় এবং পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কোনো অবস্থাতেই কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তা ও প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
_মেয়েটির এক আত্মীয় বলেন, “ও গত ২ বছর ধরে শুধু নিটের প্রস্তুতি নিয়েছে। কোচিং, মক টেস্ট, রাত জাগা—সব করেছে। আজ সকালে বেরোনোর সময়ও বারবার সময় দেখছিল। কিন্তু হাইওয়েতে একটা অ্যাক্সিডেন্টের জন্য বিশাল জ্যাম ছিল। আমরা কী করব?”
_শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, নিয়ম দরকার। কিন্তু ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পাশাপাশি ‘গ্রেস পিরিয়ড’-এর ব্যবস্থাও রাখা উচিত। যেমন, ৫ মিনিট পর্যন্ত দেরি হলে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঢুকতে দেওয়া, তবে তার OMR শিটে ‘লেট এন্ট্রি’ লিখে দেওয়া। এতে স্বচ্ছতাও থাকবে, আবার মানবিক দিকটাও রক্ষা হবে।
_বাবা সুস্থ আছেন। কিন্তু মেয়েটির চোখের জল শুকায়নি। একটা বছরের পরিশ্রম, বাবা-মায়ের স্বপ্ন—সব শেষ হয়ে গেল মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই বাবা-মেয়ের কান্না আরও একবার প্রশ্ন তুলে দিল—সরকারি নিয়মের কঠিন বেড়াজালে মানবিকতার কি কোনও স্থান নেই?
_পরীক্ষা আবার হবে এক বছর পর। কিন্তু এই এক বছরের মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা কে ফেরাবে? উত্তর খুঁজছে সমাজ।