সরকারি প্রকল্পের ফর্ম জমা দেওয়ার নথি চাওয়া থেকেই সূত্রপাত। কাগজপত্র না দেওয়া নিয়ে টানা চার-পাঁচ দিনের দাম্পত্য অশান্তি শেষ হল রক্তাক্ত পরিণতিতে। রবিবার গভীর রাতে বাঁকুড়ার সোনামুখী থানার আলমপুর গ্রামে ৯ বছরের সন্তানের চোখের সামনে স্ত্রী অম্বিকা দাসকে (৩০) ধারালো অস্ত্রে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে মারলেন স্বামী মানস দাস (৪৪)। এরপর নিজেই ঘরের ভিতর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হলেন অভিযুক্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার রাত ১টার পর হঠাৎই মাংস কাটার বড় ছুরি নিয়ে স্ত্রীর উপর চড়াও হন মানস। অম্বিকাকে উপর্যুপরি কোপাতে থাকেন তিনি। মাকে বাঁচাতে ছুটে যায় তাঁদের ৯ বছরের ছেলে। ধস্তাধস্তিতে শিশুটিও জখম হয়। রক্তাক্ত মাকে ফেলে রেখে ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে পাশের ঘরে থাকা অন্য সদস্যদের ডেকে আনে।
পরিবারের লোকজন এসে দেখেন, মেঝেতে রক্তের মধ্যে পড়ে আছেন অম্বিকা। ততক্ষণে মানস দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। পুলিশ আসার আগেই ঘরের আড়া থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় তাঁর দেহ। দুজনকেই সোনামুখী গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
দীর্ঘদিনের অশান্তি, শেষ বিন্দু হলো অন্নপূর্ণা যোজনা। পরিবারের দাবি, মানস-অম্বিকার সংসারে বহুদিন ধরেই কলহ লেগে থাকত। পারস্পরিক সন্দেহ, আর্থিক টানাপোড়েনে প্রায়ই ঝগড়া হত। মানস দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, দুর্গাপুরে তাঁর চিকিৎসাও চলছিল।
সম্প্রতি অম্বিকা অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্র জমা দিতে চান। তার জন্য স্বামীর কাছে আধার, ভোটার কার্ড-সহ কয়েকটি নথি চান। অভিযোগ, মানস নথি দিতে রাজি হননি। গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছিল। রবিবার রাতে সেই বচসাই চরম আকার নেয়।
আত্মীয় বিভাষ মণ্ডল বলেন, “ওদের ঝগড়া নতুন নয়। মানসের মাথার রোগ ছিল, ওষুধ খেত। কাগজ নিয়ে ঝামেলা হলেও আমার মনে হয় পুরনো অশান্তিই আসল কারণ।” আর এক আত্মীয়া কল্পনা বাগ জানান, “অম্বিকা বৌদি বারবার বলছিল, ফর্মটা জমা না দিলে সুবিধা পাবে না। মানসদা কিছুতেই কাগজ দিল না। এই নিয়ে রোজ চেঁচামেচি হচ্ছিল।” মানসের দাদা সঞ্জয় দাসের কথায়, “ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। কিন্তু এমন করবে ভাবিনি।”
সোনামুখী থানার পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক অসুস্থতার জেরেই এই ঘটনা। দুটি দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়েছে। আহত শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে সে প্রচণ্ড আতঙ্কে রয়েছে।
একটি সরকারি প্রকল্পের কাগজ নিয়ে শুরু হওয়া ঝগড়া কেড়ে নিল দুটি প্রাণ, অনাথ হল ৯ বছরের ছেলে। আলমপুর গ্রামে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর চোখের জল।