‘দেশ প্রকাশন’ প্রকাশিত কবি শোভা মাইতির ‘অবেলার রোদ’ : সহজ কথায় জীবনের গভীর ছবি
শারদীয় দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু উৎসব নয়, সৃষ্টিরও মরশুম। সেই সৃষ্টির লগ্ন, সপ্তমীর পুণ্য তিথিতেই পাঠকের হাতে এল কবি শোভা মাইতির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অবেলার রোদ’। প্রকাশক ‘দেশ প্রকাশন’। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই বইয়ের দর্শন – দিনের শেষ আলোয় যে রোদটুকু ম্লান হয়েও স্মৃতিকে উজ্জ্বল করে তোলে, কবি সেই অবেলার রোদ কুড়িয়ে এনেছেন কবিতার পাতায়।
কবি শোভা মাইতির এই কাব্যে আসলে এক নিভৃতচারী শিক্ষিকার আত্মকথা উন্মোচন হয়েছে। শোভা মাইতি কোনো আড়ম্বরের নাম নন। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন এক সৃজনশীল, সংঘবদ্ধ জীবনযাপনে বিশ্বাসী, মৃদুভাষী এবং নিঃশব্দে কাজ করতে ভালোবাসা মানুষ হিসেবে।
তাঁর জন্ম ১৯৭৪ সালের ২১ মে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানার অন্তর্গত খড়ুই গ্রামে। পিতা কালি প্রসন্ন মাইতি, মাতা মালতী মাইতি। শিকড় গ্রামে হলেও কর্মসূত্রে তিনি এখন নদীয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা।
ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীত নিয়ে তাঁর পথচলা। সেই সুরের সাধনার পাশাপাশি মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছিল কবিতা লেখার নেশা। সেই নেশায় তিনি মগ্ন থাকতে ভালোবাসেন। পেশাগত জীবনে তিনি কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী ঘূর্ণি স্বর্ণময়ী বিদ্যাপীঠ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছাত্রীদের নিয়ে পড়াশোনা, নানান অনুষ্ঠানে মেতে থাকা – এটাই তাঁর জগৎ। আর এই জগতের মূলমন্ত্র – ‘চরৈবেতি’। চলতে থাকো, থেমো না। এই মন্ত্রই তাঁকে কবি করে তুলেছে।
‘অবেলার রোদ’ গ্রন্থের মুখবন্ধটি কোনো প্রথাগত ভূমিকা নয়, এটি এক অকপট আত্মস্বীকারোক্তি। কবি অকপটে জানিয়েছেন, তিনি কখনও ভাবেননি যে তাঁর একটি আস্ত কবিতার বই ছাপা হবে।
মাঝে মাঝে কবিতা, ছোট গল্প, প্রবন্ধ লিখলেও সেগুলো যেখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকত। গুছিয়ে রাখার প্রয়োজনও তিনি মনে করেননি। অথচ একটু কিছু লিখতে পারলেই তিনি ভীষণ আনন্দ পেতেন। কখন সময় পাবেন আরও একটু লিখবেন, এই ভেবে মন ছটফট করত।
বহু লেখা অবহেলায় হারিয়ে গেছে। কখনও ফুলঝুরির মতো কবিতার লাইন মনে এসেছে, ভেবেছেন পরে লিখবেন, কিন্তু আর মনে আসেনি। রাতের অন্ধকারে হঠাৎ লাইন মাথায় এসেছে, ভেবেছেন উঠে লিখে নেবেন, কিন্তু অনভ্যাস আর কুঁড়েমিতে তা হারিয়ে গেছে। এই হারানোর বেদনাই আসলে একজন প্রকৃত কবির জন্ম দেয়।
বেশ কয়েক বছর ধরে যখন কবিতা তাঁকে প্রবলভাবে পেয়ে বসত, তখন তিনি লিখে ফেলতেন। কখনও তা স্কুলের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। তারপর থেকে ধারাবাহিক লেখা। তিনি বলেছেন, বিচিত্র বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতি, ফুল, পাখি তাঁর ভীষণ পছন্দের। তিনি চান, কবিতা-মনস্ক পাঠকের ভালো লাগলেই তাঁর প্রচেষ্টা সার্থক। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন লেখক, প্রাবন্ধিক স্বপন মৈত্র, বিশিষ্ট কবি-গীতিকার গৌরব কৃষ্ণ পান্ডা এবং তাঁর আপনজনদের, যাঁদের উৎসাহেই এই বই আলোর মুখ দেখেছে।
এই প্রতিবেদনে কবির পাঁচটি কবিতা আলোচিত হলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
কবিতার ভুবন – পাঁচটি জানালা, পাঁচটি জীবন
‘অবেলার রোদ’ গ্রন্থের বৈচিত্র্য এর বিষয়ে। এখানে একই সাথে গ্রাম, শহর, ইতিহাস, ভাষা, ভক্তি ও হাস্যরস মিলেমিশে গেছে। পাঁচটি কবিতার মধ্যে দিয়ে সেই বৈচিত্র্যের আভাস পাওয়া যায়।
১. ফেরিওয়ালা – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা:
এটি এই গ্রন্থের সবচেয়ে স্নিগ্ধ কবিতা। দুপুর বেলা এ গলি ও গলিতে ফেরিওয়ালা হাঁকছে, ‘কিছু কি লাগবে গো?’ ধুলো মাখা গায়ে একজন, দুজন, তিনজন করে ছেলে-মেয়েরা ভিড় করছে। ‘কি আছে তোমার ঝুড়িতে?’ উত্তর আসে – সব আছে। খেলনা গাড়ি, বেলুন, চুলের ফিতে, ক্লিপ, পুতুল, ব্যাট-বল, হাঁড়ি, কড়াই, খুন্তি।
এরপরই কবিতা বাঁক নেয় দর্শনের দিকে। একটি শিশু বলে, সে গাড়ি নিয়ে মাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। তখন ফেরিওয়ালা তাকে বলে, সে এমন এক গাড়ির সন্ধান দেবে যাতে সে দূর দেশে অনেকজনকে নিয়ে যেতে পারবে। দাদু, ঠাম্মা সবাইকে। এটি আসলে জ্ঞানের গাড়ি, বইয়ের গাড়ি, শিক্ষার গাড়ি। আর এক জন বেলুন চাইলে ফেরিওয়ালা বলে, এমন বেলুন দেবে যা দিয়ে সে আকাশ পেরিয়ে যাবে।
এখানে ফেরিওয়ালা আর বিক্রেতা নন, তিনি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। একজন শিক্ষিকা হিসেবে কবি শোভা মাইতি শিশুদের হাতে খেলনার ছলে কল্পনার বীজ বুনে দিচ্ছেন। ‘দূরেই তো যেতে হবে, তবেই অনেক কিছু জানতে পারবে’ – এই পংক্তিটি এই গ্রন্থের মূল সুর।
২. একুশ – একুশের চেতনা:
মাত্র বারো লাইনের এই কবিতাটি একটি মহাকাব্যের সংক্ষিপ্তসার। ‘একুশ মানে শপথ নেওয়া, একুশ মানে দৃঢ়চেতা, একুশ মানে স্মৃতিচারণ…’ – এই ভাবে কবি একুশকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। একুশ মানে বরকত, সালাম, প্রাণ চঞ্চল, দোদুল দোলা, ঐক্যবদ্ধ, কথকতা, ফেব্রুয়ারি, উচ্চ শির, মায়ের ভাষা, শহীদ সেলাম।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, রক্ত, অহংকার, শোক ও গর্ব – সবকিছুকে কবি এক সরল তালিকায় গেঁথে দিয়েছেন। এটি পাঠকের মনে শপথের আগুন জ্বালায়।
৩. আজি গাও মহাগীত – ইতিহাসের প্রতি প্রণাম:
এটি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি। কৃষ্ণনগরে জন্ম নিয়ে জগৎখ্যাত হওয়া, পিতা টপ্পা খেয়াল গায়ক, সরকারের বৃত্তি নিয়ে কৃষি বিদ্যা শিখতে বিদেশ যাওয়া ও দেশে ফিরে সরকারি কর্তা হওয়া, এবং ছোটবেলা থেকেই স্বরচিত কবিতা ও গানে সমাদৃত হওয়া – এই সব তথ্য দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে নির্দেশ করে।
‘নাটক গান সাহিত্যে তুমি স্মরণীয় কবি, ব্যাঙ্গাত্মক কথা হাসির মোড়কে পাল্টালে ছবি। সাজাহান চন্দ্রগুপ্ত তারাবাঈ একঘরে, তোমারই লেখা নাটক আজো সমাদর করে।’ কবি শেষে বলেছেন, স্বদেশ ভূমি মাতৃভূমি সকল দেশের সেরা, স্বপ্ন দিয়ে সাজালে তা স্মৃতি দিয়ে ঘেরা। চির স্মরণীয় কবি রবে যুগ যুগান্তর ধরে। এই কবিতায় কবির ইতিহাস-চেতনা ও দেশপ্রেম প্রকাশিত।
৪. আগমনী বার্তা – মা’কে আহ্বান:
এটি দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে লেখা এক আর্তি। ‘মা…এসো মা… আর কতদিন তোমায় ছাড়া থাকব এ জগতে, অসুরের সংখ্যা মাগো বাড়ছে দিনে রাতে…’। কবি বলছেন, তুমি অসুর নাশিনী, সংকট হারিণী, কল্যাণ করো মা জগত্তারিণী। তোমা বিনা এ হিয়া যে শূন্য, আঁখি তারায়। কৈলাসেতে পুত্র-কন্যা নিয়ে থেকো না, মর্ত্যের অবস্থা অধোগামী। কার্তিক, গণপতি, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও দেবপতিকে সঙ্গে নিয়ে এসো মা। শিব শ্মশানে মশানে ঘোরে বাঘছাল পরে, ভালো পোশাক কিনে দিও। আর দেরি সয় না। তোমায় নিয়ে করব মজা, খাব পেট পুরে। এই কবিতায় ভক্তি ও বাঙালির চিরন্তন পুজোর আবেগ মিশেছে।
৫. তিন্নি পিসি – হাসির ছড়ায় বাস্তব:
এটি গ্রন্থের সবচেয়ে হাস্যরসাত্মক কবিতা। তিন্নি পিসি গিন্নি সেজে চলেছেন পাইকপাড়ায়, সেখানে তাঁর মায়ের মামার ছেলেদের তিনতলা ফ্ল্যাট। হারু তরু ন’মামা আর নতুন মাসির সাথে দেখা হবে ভেবে হাসি। বেশি দিন থাকা হবে না ভেবে ব্যাগ মোটে চার খানা, তাতে নাড়ু, আচার মিলিয়ে ন’খানা শিশি।
বাতের ব্যথা, পায়ের হাড় বেড়েছে, ওজন একটু বাড়তি, মাঝে মাঝে মাথা ঝিমঝিম করে। বাস ধরবেন না বলে অটোয় চড়লেন, ভিড় বলে আড়াই ঘণ্টা ধরে চলল। যাই হোক পাইকপাড়ায় এলেন, লিফটে উঠবেন না সিঁড়ি ধরে চললেন, উঠেই আর দাঁড়াতে পারেন না, ‘হাঁটু গেল ওরে বাবারে এবার করো পার।’
এই কবিতায় বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের পিসি-মাসিদের চিরচেনা, আদুরে ছবিটি ফুটে উঠেছে। কবির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও রসবোধের পরিচয় এখানে স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে ‘অবেলার রোদ’ কোনো কঠিন কাব্যতত্ত্বের বই নয়। এটি সহজ কথায় জীবনের ছবি। একজন শিক্ষিকা, একজন মা, একজন মেয়ে, একজন গ্রামের মানুষের চোখ দিয়ে দেখা জীবন। এখানে ফেরিওয়ালা স্বপ্ন দেখায়, একুশ শপথ নিতে শেখায়, মহাগীত ইতিহাসকে মনে করায়, আগমনী বার্তা মাকে ডাকে, আর তিন্নি পিসি হাসায়।
এই বৈচিত্র্যই কবি শোভা মাইতির শক্তি। ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রে বিশ্বাসী এই কবির প্রথম গ্রন্থ নিঃসন্দেহে পাঠকের মনে অবেলার রোদের মতোই এক নরম, সোনালি আলো ফেলে যাবে।