বাঘের কাণ্ডে হতবাক বিশ্ব ! অচৈতন্য রক্ষককে বাঁচাতে ‘অ্যালার্ম’ বাজাল বাঘ
ভোর তখন সবে হয়েছে। কুয়াশার চাদর তখনও পুরোপুরি সরেনি প্রাণিসম্পদ রক্ষা কেন্দ্রের উপর থেকে। রোজকার মতোই সকালের প্রথম ডিউটিতে বেরিয়েছিলেন কেন্দ্রের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও পুরনো কর্মী জুলিয়ান। প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি এই কেন্দ্রে আছেন। বাঘ, সিংহ, চিতা – হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা দেখে নতুন কর্মীরা অবাক হয়ে যান। কিন্তু জুলিয়ান জানেন, ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে যে কোনও প্রাণীর মন জয় করা যায়।
সেদিনও তিনি রোজকার রুটিন মেনে বাঘের ঘেরের পাশের পরিধি বরাবর পাহারা দিচ্ছিলেন। হাতে লাঠি, কাঁধে ওয়াকি-টকি। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর শরীরটা কেমন যেন হালকা লাগতে শুরু করল। মাথা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। তিনি বুঝতে পারলেন, কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। তারের বেড়াটা ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে বেড়ার ঠিক পাশেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। নিথর, নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইলেন তিনি। চারপাশে তখন কেউ নেই। অনেক দূরে কন্ট্রোল রুম। এই অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকলে কী হতে পারত, ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ওই ঘেরের ভেতরেই ছিল খান।
খান একটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ওজন প্রায় ২২০ কেজি। কিন্তু এই বিশাল, ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রাণীটির সঙ্গে জুলিয়ানের সম্পর্কটা একেবারে অন্যরকম। খান যখন মাত্র কয়েক মাসের শাবক, মা হারা অবস্থায় এই কেন্দ্রে এসেছিল, তখন থেকেই জুলিয়ান তাকে নিজের হাতে বড় করেছেন। ফিডিং বোতলে করে দুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে, অসুস্থ হলে রাত জেগে পাহারা দেওয়া – সব করেছেন জুলিয়ান। তাই খানের কাছে জুলিয়ান শুধু একজন তত্ত্বাবধায়ক নন, তিনি তার বাবা, তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
জুলিয়ানকে ওভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে খান প্রথমে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারপরই সে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে এল ঘেরের একদম ধারে। তার বিশাল শরীরটা দিয়ে সে স্টিলের শক্ত জালের কাঠামোটাকে চেপে ধরল, যেন জাল ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়।
এরপর সে এমন এক কাণ্ড করল, যা দেখে কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ দেখা কর্মীদের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল।
খান তার বিশাল, থাবাটা – যে থাবার এক আঘাতে একটি মহিষ পর্যন্ত কুপোকাত হয়ে যায় – সেই থাবাটা অত্যন্ত সাবধানে জালের ফাঁক দিয়ে বাইরে বের করে আনল। কোনও আক্রমণ নয়, কোনও হিংস্রতা নয়। সে তার নখগুলো ভেতরে গুটিয়ে রেখে, অবিশ্বাস্য কোমলতায় জুলিয়ানের কাঁধে, বাহুতে আলতো করে ছুঁতে লাগল, ধাক্কা দিতে লাগল। যেন বলছে – “ওঠো, কী হয়েছে তোমার? ওঠো।” একবারের জন্যও সে থাবাটা ভেতরে টেনে নিল না। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে সে একইভাবে জুলিয়ানকে জাগানোর চেষ্টা করে গেল।
এই অস্বাভাবিক দৃশ্যটি প্রথম নজরে পড়ে দূরে থাকা আরেক সহকর্মী মার্কের। তিনি দূর থেকে দেখেন, বাঘটি তার ঘেরের জালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং একজন মানুষ মাটিতে পড়ে আছে। তিনি ভেবেছিলেন, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে। বাঘ হয়তো আক্রমণ করবে। তিনি চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসেন।
কিন্তু কাছে এসে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। খানের মধ্যে আগ্রাসনের কোনও চিহ্নই নেই। তার কান পেছনে নয়, লেজ নাড়ছে না উত্তেজনায়। বরং তার চোখে এক অদ্ভুত উদ্বেগ, এক অস্থিরতা।
মার্ককে দেখেও খান থামল না। বরং সে এবার মুখ তুলে তাকাল ঘেরের উপরে লাগানো সিকিউরিটি ক্যামেরার দিকে। এবং তারপর সে এক গভীর, ভারী, ঘড়ঘড়ে শব্দ করতে শুরু করল। প্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই শব্দকে বলেন ‘চাফিং’। বাঘেরা সাধারণত এই শব্দ করে নিজেদের সঙ্গীকে বা সন্তানকে ডাকতে, বা বিপদের সময় সঙ্কেত দিতে। এটা কোনও গর্জন নয়, এটা একটা জরুরি বার্তা।
খান একটানা সেই শব্দ করে যাচ্ছিল, আর বারবার জুলিয়ান এবং ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছিল। মার্কের বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না – বাঘটি সাহায্য চাইছে। সে রীতিমতো অ্যালার্ম বাজাচ্ছে।
মার্ক সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকি-টকিতে কন্ট্রোল রুমে খবর দেন – “জুলিয়ান অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে টাইগার জোনে, ইমার্জেন্সি টিম পাঠাও, তাড়াতাড়ি!”
মুহূর্তের মধ্যে চিকিৎসক ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। ততক্ষণ পর্যন্ত খান একচুলও নড়েনি। সে ব্যারিকেডের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। চিকিৎসকরা যখন জুলিয়ানের কাছে গিয়ে তার চোখে আলো ফেলছেন, পালস চেক করছেন, তখন খান নিঃশব্দে, অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সবটা দেখছিল। তার মধ্যে কোনও অস্থিরতা নেই, কোনও হিংস্রতা নেই, শুধু অপেক্ষা।
চিকিৎসকরা জুলিয়ানকে স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরই খান ধীরে ধীরে ঘেরের ভেতরের দিকে চলে যায়। তার দায়িত্ব শেষ।
পরে হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানান, প্রচণ্ড ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এবং অতিরিক্ত গরমে কাজ করার কারণে জুলিয়ানের রক্তচাপ হঠাৎ করে বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। এর ফলে তিনি জ্ঞান হারান। যদি আরও কিছুক্ষণ ওই অবস্থায় পড়ে থাকতেন, তাহলে তাঁর প্রাণহানিও হতে পারত। কিন্তু খানের উপস্থিত বুদ্ধি এবং ভালোবাসার কারণে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেন।
এই ঘটনা গোটা কেন্দ্রে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। যে প্রাণীকে আমরা হিংস্র, বন্য বলে দাগিয়ে দিই, তার ভেতরেও যে কতটা মমতা, কৃতজ্ঞতা আর বুদ্ধিমত্তা থাকতে পারে, খান তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
দু’সপ্তাহ পর, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে জুলিয়ান যখন আবার কাজে ফিরলেন, সেদিন তিনি প্রথমে নিজের অফিসে যাননি, বা অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করেননি। তিনি সোজা চলে গিয়েছিলেন খানের ঘেরের সামনে। হাতে ছিল খানের প্রিয় মাংস। জালের এপার থেকে জুলিয়ানকে দেখে খান ছুটে এসেছিল। দু’জনের চোখে তখন এক অন্যরকম ভাষা – যে ভাষায় কোনও শব্দ লাগে না, শুধু হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের কথা বোঝা যায়।