চিত্রশিল্পী জ্যোতির্ময় জানার সঙ্গে কথা বললেন কবি মানস কুমার মাইতি, প্রসঙ্গ: শিল্পী বসন্ত কুমার জানার জীবন, সংগ্রাম ও অপ্রকাশিত ইতিহাস
. _পিতার ছায়ায় পুত্রের লড়াই:-
_পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরা থানার অন্তর্গত এগরা পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ড। সেখানেই পৈতৃক ভিটেয় বসবাস করেন চিত্রশিল্পী জ্যোতির্ময় জানা। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলার শিল্প-ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের ধারক। তাঁর পিতা প্রয়াত বসন্ত কুমার জানা ছিলেন এমন এক চিত্রকর, যাঁর জীবন মিশে আছে দারিদ্র্য, প্রতিভা, বিতর্ক আর ট্র্যাজেডির সঙ্গে।
১. দারিদ্র্যের সঙ্গে সহবাস: শিল্পীর জন্ম ও জীবন সংগ্রাম:-
_অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত এগরা গ্রামে ( তখন গ্রাম ) এক অতি সাধারণ, দরিদ্র পরিবারে বসন্ত কুমার জানার জন্ম। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ ছিল। কিন্তু পেটের ভাত জোগাড় করাই যেখানে প্রধান লড়াই, সেখানে রঙ-তুলি তো বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়।
_একসময় সংসার চালাবার জন্য বসন্তবাবুকে বেশ কয়েক বছর এগরা সারদা শশীভূষণ কলেজে নৈশপ্রহরীর কাজ করতে হয়েছে। দিনের আলোয় কলেজের গেট পাহারা আর রাতের অন্ধকারে কুমোরপাড়ার মাটির কুপির আলোয় ছবি আঁকা — এভাবেই চলেছে তাঁর শিল্প সাধনা। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সুযোগ কিন্তু তিনি পাননি। মাটির দেওয়াল, খাতার পাতা, যা পেয়েছেন তাতেই তুলির আঁচড় দিয়েছেন। তবে দারিদ্র্য তাঁর শরীরকে ক্লান্ত করলেও শিল্পী সত্তাকে কিন্তু এতটুকুও দমাতে পারেনি।
২. গুরু শিষ্যের ২৩ বছর: যামিনী রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক:-
_চিত্র শিল্পী বসন্ত জানার জীবনের মোড় ঘোরে ১৯৪৯ সালে। সেসময় ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত আধুনিক ভারতীয় শিল্পের দিকপাল যামিনী রায়কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। লোকশিল্পকে যেভাবে যামিনী রায় আধুনিকতার মোড়কে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন, তা বসন্তবাবুকে অনুপ্রাণিত করে।
_এরপর নিজের আঁকা কিছু ছবি নিয়ে তিনি সোজা হাজির হন কলকাতায় যামিনী রায়ের বালিগঞ্জের বাড়ি ‘রায় ভিলা’য়। যামিনী রায় সেই অখ্যাত গ্রামীণ তরুণের কাজ দেখে মুগ্ধ হন। শুরু হলো এক অভূতপূর্ব গুরু-শিষ্য সম্পর্ক। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭২, যামিনী রায়ের মৃত্যু পর্যন্ত টানা ২৩ বছর এই যোগাযোগ ছিল অটুট।
_বসন্তবাবু নিয়মিত কলকাতায় যেতেন। ছবি দেখাতেন, পরামর্শ নিতেন। যামিনী রায় তাঁকে ‘তুমি’ সম্বোধন করতেন এবং তাঁর আঁকাকে ‘সহজ ও প্রাণবন্ত’ বলে প্রশংসা করতেন। আর্থিক অনটনের কথা জেনে যামিনী রায় ও তাঁর পরিবার মাঝে মাঝেই বসন্তবাবুকে মানি অর্ডার করে টাকা পাঠাতেন।
চিঠির যুগ:-
_এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দলিল হল সেই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র। গবেষকদের দাবি, যামিনী রায় ও তাঁর পুত্ররা বসন্ত জানাকে চারশোরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে থাকত ছবির মূল্যায়ন, শিল্প-ভাবনা, এমনকি ব্যক্তিগত খোঁজখবরও। বসন্তবাবুও অসংখ্য চিঠি লিখতেন গুরুকে। যামিনী রায়ের মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসন্তবাবুর যোগাযোগ ছিল।
৩. রহস্য, বিতর্ক ও বিস্মৃতি: এক শিল্পীর অন্তর্ধান:-
_২০০৯ সালে প্রায় নিঃস্ব ও লোকচক্ষুর আড়ালে প্রচারের আড়ালে থাকা চিত্রশিল্পী বসন্ত কুমার জানার মৃত্যু হয়। আর তাঁর মৃত্যুর পরেই শিল্পমহলে দানা বাঁধে একের পর এক বিতর্ক ও রহস্য।
_কোথায় গেল ছবিগুলো?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — বসন্ত জানার আঁকা মূল ছবিগুলো এখন কোথায়? তিনি ২৩ বছর ধরে যামিনী রায়কে যে ছবিগুলো দেখাতেন বা দিতেন, তার একটিও যামিনী রায়ের সংগ্রহে পাওয়া যায়নি কেন? আবার বসন্ত জানার নিজের কাছেও তাঁর আঁকা ছবির কোনো উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ নেই কেন ? কে দেবে এর উত্তর ? না উত্তর বোধহয় কেউই দেওয়ার নেই, হয়তো বা গবেষণার সিঁড়ি বেয়ে একপা দুপা করে উঠতে উঠতে খুব দেরি করে হলেও উত্তর মিলবে একদিন — এ আশা আমরা করতেই পারি।
যামিনী রায়ের পরিবার ৪০০-র বেশি চিঠি লিখলেও বসন্তবাবুর কাছে তার সামান্যই খুঁজে পাওয়া গেছে। আবার বসন্তবাবু যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন, তার একটিও যামিনী রায়ের বাড়ি বা সংগ্রহশালায় মেলেনি।
_এই ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিল্প-গবেষকদের একাংশের মত, যামিনী রায়ের বিপুল খ্যাতি ও ‘ব্র্যান্ডে’র ছায়ায় বসন্ত জানার মৌলিক সৃষ্টি ও স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে গেছে। তিনি কি যামিনী রায়ের ‘স্টাইল’ নকল করতেন, নাকি তাঁর নিজস্ব ধারা ছিল? ছবিগুলো না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। অনেকে মনে করেন, দারিদ্র্যের তাড়নায় হয়তো তিনি নিজের ছবি বিক্রি করে দিয়েছেন বা নষ্ট হয়ে গেছে।
৪. পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: গ্রন্থ ও প্রদর্শনী:-
বসন্ত জানার জীবনের এই ট্র্যাজিক অধ্যায়কে সামনে এনেছেন গবেষক অতীশ পাল ও প্রদোষ পাল। তাঁদের দীর্ঘ অনুসন্ধান ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বসন্ত জানা: এক অবরুদ্ধ চিত্রকর – সম্ভবের এক বিনাশকথা’_। এই বইটিই প্রথম বসন্ত জানাকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দলিল। বইতে যামিনী রায়ের লেখা কিছু চিঠির প্রতিলিপি, বসন্তবাবুর জীবনের খুঁটিনাটি এবং এই রহস্য নিয়ে বিশ্লেষণ আছে।
৫. উত্তরাধিকার বহন: জ্যোতির্ময় জানার লড়াই:-
_পিতার মৃত্যুর পর সেই অসমাপ্ত লড়াইটা জারি রেখেছেন পুত্র জ্যোতির্ময় জানা। তিনিও একজন চিত্রশিল্পী। তাঁর কথায়, “বাবা সারাজীবন শুধু দিয়ে গেছেন, প্রচারের আলোয় আসেননি। তাঁর আঁকা, তাঁর চিঠি, তাঁর স্মৃতি — সবই যেন একটা চক্রান্তে হারিয়ে গেছে। আমি চাই মানুষ জানুক, এগরার এক প্রহরীও যামিনী রায়ের স্নেহধন্য শিল্পী ছিলেন।”
_জ্যোতির্ময়বাবু আজও এগরার বাড়িতে বাবার সামান্য কিছু স্মৃতি, দু-একটা স্কেচ, আর যামিনী রায়ের লেখা হাতে গোনা কয়েকটি চিঠি আগলে রেখেছেন। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি সংগ্রহশালা বা প্রদর্শনীর স্বপ্ন দেখেন তিনি, যাতে বসন্ত কুমার জানা শুধু ‘যামিনী রায়ের শিষ্য’ পরিচয়ে আটকে না থেকে একজন স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে মর্যাদা পান।
শেষকথা :-
_বসন্ত কুমার জানার জীবন বাংলার শিল্প-ইতিহাসের এক করুণ কবিতা। প্রতিভা থাকলেই যে স্বীকৃতি মেলে না, প্রান্তিকতার অন্ধকার যে কীভাবে আলোকে গ্রাস করে, তাঁর জীবন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। জ্যোতির্ময় জানার লড়াই তাই শুধু পিতার স্মৃতি রক্ষার নয়, বাংলার বিস্মৃত শিল্পীদের ইতিহাসে ফিরিয়ে আনার লড়াইও বটে।
muthokotha.in @alakeshmaityঅলকেশ মাইতি