ছকভাঙা স্বপ্ন দেখার সাহসটা অনেক সময় শিশু কিশোরদের মনকে দখল করে বসে। সেই দখলদারিত্বের অধিকার থেকে বাঁধাধরা জীবনের গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে পড়তে মন চায় অজানা জগতে। আর এইরকমই কল্পনার জগতে পৌঁছে যাওয়ার সাহস জমেছিল কেরালার তিন স্কুলপড়ুয়ার। ঘর ছেড়ে, স্কুল ছেড়ে সোজা পাহাড়ের চূড়ায় তাঁবু খাটিয়ে তিন বন্ধু শুরু করেছিল নিজেদের ‘মুক্তির সংসার’। তবে পুলিশের চোখ এড়ানো গেল কই? শেষমেশ পরিবারের কোলে ফিরতেই হল তিন কিশোরকে।
পরিকল্পনার নিখুঁত ছক:
তিনজনই কোঝিকোড়ের বাসিন্দা, একই স্কুলের ছাত্র। বয়স ১৫-১৬-র ঘরে। বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয় তারা। কিন্তু স্কুলের বদলে তাদের গন্তব্য ছিল ওয়েনাড়ের ভাদুভানচাল এলাকার চিত্রগিরির কাছে গভীর জঙ্গল। সঙ্গে ত্রিপল, চাল, রুটি, ছুরি, রান্নার হাঁড়ি—একরাত কাটানোর পুরো রসদ। খরচের জন্য নিজেদের চারটি মোবাইলের দুটি বিক্রি করে জোগাড় করে ১০ হাজার টাকা। বাকি দুটি ফোন সুইচ অফ করে নিজেদের কাছে রেখে দেয়, যাতে লোকেশন ট্র্যাক না হয়। লোকালয় থেকে দূরে, প্রায় পাঁচ একর জুড়ে ছড়ানো এক পাহাড়চূড়ায় তাঁবু ফেলে তিন বন্ধু।
নিখোঁজ ডায়েরি, রাতভর তল্লাশি:
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা গড়াতেই তিন কিশোরের বাড়িতে উদ্বেগ। স্কুল থেকে না ফেরায় থানায় হাজির হন অভিভাবকরা। অপহরণ নয়, মুক্তিপণ চেয়ে ফোনও আসেনি—তাহলে গেল কোথায় তিনজন? ফোন বন্ধ থাকায় দুশ্চিন্তা বাড়ে পুলিশের।
তদন্তে মোড় ঘোরে এক শ্রমিকের তোলা ছবিতে। স্কুল থেকে বেশ দূরে তিনজনকে দেখে সন্দেহ হওয়ায় ছবি তুলে স্কুলে পাঠান তিনি। সেই ছবি থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হয়, তিনজনের গন্তব্য এক। সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে দেখা যায়, লাক্কিদি ঘাট পেরিয়ে ওয়েনাড়ের দিকে গিয়েছে তারা। এরপরই জঙ্গলজুড়ে শুরু হয় চিরুনি তল্লাশি।
ধরা পড়ার সিনেমাটিক ক্লাইম্যাক্স:
শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথম একজনের খোঁজ পান। পুলিশ আসছে টের পেয়ে বাকি দুজন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয়রা নিজেদের গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করেন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পাডিভিয়ালের কাছে ধরা পড়ে বাকি দুজন। তিনজনকেই নিয়ে যাওয়া হয় মেপ্পাদি থানায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদের।
‘ঘরবন্দি’ দশা থেকে পালাতে চেয়েছিলাম:
পুলিশের কাছে তিন কিশোর জানিয়েছে, রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতেই এই ‘অ্যাডভেঞ্চার’। আপাতত স্বস্তিতে পরিবার। তবে পুলিশের পরামর্শ, তিনজনেরই কাউন্সেলিং প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও বলা হয়েছে ছেলেদের সঙ্গে সময় কাটাতে, কথা বলতে।
প্রশ্ন একটাই—মুক্তির স্বাদ পাওয়া এই তিন কিশোর আবার কখনো ‘লুকোচুরি’ খেলতে বেরিয়ে পড়বে না তো ? আবার কখনো কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার অমলকান্তি হয়ে উঠতে চাইবে না তো ? —- চিন্তায় চিন্তায় দিন কাটছে অভিভাবকদের।