বর্ষায় দিঘা-ফেরত আনন্দের যাত্রা শেষ হল নয়নজুলিতে, এসি বাস উল্টে রক্তাক্ত ১০ পর্যটক — কাঁথিতে ফের প্রশ্নের মুখে হাইওয়ে সুরক্ষা
কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর: সমুদ্রের ঢেউয়ে মন ভিজিয়ে কলকাতায় ফেরার পথে মুহূর্তে বদলে গেল ছবিটা। দিঘা থেকে কলকাতাগামী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘সন্তোষ’ বাস পাল্টি খেয়ে পড়ল রাস্তার পাশের নয়নজুলিতে। বর্ষার পিছল রাস্তা, এক বাইক আরোহীকে বাঁচানোর চেষ্টা আর চালকের মুহূর্তের অসতর্কতা—তিনে মিলে ছুটির আনন্দ ডুবে গেল আতঙ্কে। দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন যাত্রী গুরুতর জখম হয়ে এখন কাঁথি দারুয়া মহকুমা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার দুপুর নাগাদ দিঘা থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয় ‘সন্তোষ’ নামের এসি বাসটি। কাঁথির ছত্রধরা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় আচমকাই একটি বাইক বাসের সামনে চলে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বাইক আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে চালক হঠাৎ জোরে ব্রেক কষেন ও স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেন। বর্ষায় পিচ্ছিল রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি প্রথমে রাস্তার ধারে গার্ডওয়ালে ধাক্কা খায়, তারপর সোজা উল্টে পড়ে পাশের গভীর নয়নজুলিতে।
বাসের জানালার কাচ ভেঙে, লাগেজ ছিটকে পড়ে চারদিকে। যাত্রীদের আর্ত চিৎকারে কেঁপে ওঠে এলাকা। অনেকেই সিটবেল্ট না বাঁধায় সিট থেকে ছিটকে পড়ে মাথা, হাত-পায়ে গুরুতর চোট পান।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে ছুটে আসেন ছত্রধরার স্থানীয় বাসিন্দারা। তারাই প্রথমে জানালা ভেঙে, দরজা কেটে আহতদের টেনে বের করতে শুরু করেন। খবর পেয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কাঁথি থানার পুলিশ ও দমকলের উদ্ধারকারী দল। ক্রেন এনে বাসটিকে সোজা করা হয়। অ্যাম্বুল্যান্সের অভাবে পুলিশের গাড়ি ও টোটোতেই আহতদের কাঁথি দারুয়া মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, আহত ১০ জনের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুজনের মাথায় গভীর ক্ষত, একজনের পা ভেঙেছে, বাকিদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা-ছেঁড়া। প্রাথমিক চিকিৎসার পর দুজনকে কলকাতায় রেফার করা হতে পারে।
দিঘা-কলকাতা ১১৬বি জাতীয় সড়কের অন্যতম ব্যস্ত অংশে দুর্ঘটনা ঘটায় মুহূর্তে কয়েক কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। পর্যটকদের গাড়ি, ট্রাক, লোকাল বাস দাঁড়িয়ে পড়ে। কাঁথি ট্র্যাফিক পুলিশ ক্রেন দিয়ে বাস সরিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
প্রাথমিকভাবে বাইক আরোহীকে বাঁচাতে গিয়েই দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। তবে বাসের গতি কত ছিল, চালকের লাইসেন্স বৈধ কি না, ব্রেক-টায়ারের অবস্থা কেমন ছিল—সব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাসের ব্ল্যাকবক্স ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাইক আরোহীকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মামলা হতে পারে।
বর্ষা শুরু হতেই দিঘা-মন্দারমণি-তাজপুর রুটে দুর্ঘটনা বাড়ছে। সরু রাস্তা, বেহাল নিকাশি, নয়নজুলিতে গার্ডওয়াল না থাকা এবং বেপরোয়া বাইক-টোটো—সব মিলিয়ে জাতীয় সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছত্রধরা মোড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, তবু স্পিড-ব্রেকার বা সিগন্যাল নেই।
কলকাতার বেহালার এক বাসিন্দা স্বামী-সন্তান নিয়ে দিঘা গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ, তারপর সব অন্ধকার। চোখ খুলে দেখি জলের মধ্যে।” পাশের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন হাওড়ার এক বৃদ্ধ। মাথায় ৮টি সেলাই। “ভেবেছিলাম সমুদ্র দেখে ফিরছি, যমদূত দেখে ফিরলাম”, কাঁপা গলায় বললেন তিনি।
পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “আহতদের চিকিৎসায় সবরকম সাহায্য করা হচ্ছে। দিঘা রুটে স্পিডগান ও নাকা চেকিং বাড়ানো হবে। নয়ানজুলি বরাবর ক্র্যাশ-ব্যারিয়ার বসানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে NHAI-কে।”
এক বেলার আনন্দ-ভ্রমণ শেষ হল হাসপাতালের বেডে। বর্ষার দিঘা সুন্দর, কিন্তু ফেরার রাস্তাটা কতটা নিরাপদ—প্রশ্নটা আবার তুলে দিয়ে গেল ‘সন্তোষ’ বাসের উল্টে পড়া চাকা।