চাই আবহাওয়া অনুযায়ী বিদ্যালয়ের সময়সূচি

Muthokotha.in, অলকেশ মাইতি:– ‘প্রয়োজনে সকালে ক্লাস’ – পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের যে একটি সময়োপযোগী ও ভীষণ বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত , তার জ্বলন্ত প্রমাণ সম্প্রতি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দেখতে পাওয়া গেল।
গরমের ছুটি শেষে গত ১ জুন সরকারি নির্দেশে স্কুল খোলে। পূর্ব নির্ধারিত রুটিন মেনে সকাল ১০টা ৩০ থেকে বিকেল ৪টা ৩০ পর্যন্ত ক্লাসও আরম্ভ হয়। একটি গ্রামীণ পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর দুই ব্লকের বারবাটিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট পড়ুয়া প্রায় ৪৫০। গরমের ছুটির পর প্রথম দিন হাজির ছিল মাত্র ৩৫ জন, দ্বিতীয় দিন ছিল ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী।

এইরকম অনুপস্থিতির মূল কারণ হলো — তীব্র তাপপ্রবাহে বিশেষ করে ৪২-৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভরসা পাচ্ছিলেন না। ওই সময়ে দুপুরের দিকে ক্লাসরুমগুলো একপ্রকার ‘হিট চেম্বার’ হয়ে উঠছিল, আসা যাওয়ার পথেও সেই একই সমস্যা। ক্লাসরুমের মধ্যে ফ্যান চললেও গরম হাওয়া, ঘামে ভেজা জামা, ডিহাইড্রেশনের ভয়ে পড়ুয়ারা মোটেও পড়ায় মন দিতে পারছিল না। ফলে উপস্থিতি তো কম ছিলই, পঠনপাঠনের মানও একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে ৩ জুন থেকে সরকারি পরামর্শ মেনে মর্নিং সেশন চালু হতেই কিন্তু চিত্রটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। যে স্কুলের কথা শুরুতে বলছিলাম, ওই স্কুলে সকাল ৬ টা ৪০ থেকে ১০ টা ৫০ পর্যন্ত ক্লাস টাইম নির্ধারিত করা হয়। প্রথম দিনই ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতির সংখ্যা ৩৫০ পেরিয়ে গেলো। দ্বিতীয় দিন ৪ জুন হাজির প্রায় ৯৫% পড়ুয়া। এমনকী আজ ১৩ জুন পর্যন্ত পড়ুয়াদের উপস্থিতি ছিল নজর কাড়া। শুধু যে সংখ্যার পরিবর্তন হয়েছে তা নয়, পড়ুয়াদের মানসিকতারও পরিবর্তন হয়েছে। তাদের চোখে-মুখে স্বস্তিও ছিল দেখার মতো। সকালের ঠান্ডা আবহাওয়ায় ওরা মন দিয়ে পড়ছে, প্রশ্নও করেছে, টিফিনের পর কিন্তু ঝিমিয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। পটাশপুর দুই ব্লক এলাকার বহু স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সমস্ত স্কুলেই পড়ুয়াদের উপস্থিতি প্রায় একই।
অতিরিক্ত গরম শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নয়, ‘কগনিটিভ লোড’ বাড়িয়ে শেখার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। ‘হু’-এর একটি রিপোর্ট বলছে, ৩৫ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা উঠে গেলে ক্লাসরুমে মনোযোগ অন্তত ৩০% পর্যন্ত হ্রাস পায়। এছাড়া গ্রামের স্কুলগুলোতে বেশিরভাগ পড়ুয়াকে দুপুরে মাঠের কাজ বা ঘরের কাজে হাত লাগাতে হয়। সকালে স্কুল হলে তারা মোটামুটি দুটো দিকই সামলানোর চেষ্টা করে। উপস্থিতি বাড়া মানে কিন্তু শিক্ষার মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে না পড়া। সকালে স্কুল হলে একঘেঁয়েমির বিষয়টা থাকে না। সময়সূচির পরিবর্তন একটা “নতুন নতুন গন্ধ” বয়ে আনে!”আহা! বেলা ১১টায় স্কুল ছুটি! পুরো দিনটা তো বাকি আছে”— এই স্বাধীনতার অনুভূতিটা কিন্তু দারুণ। ক্লান্তি কম, মেজাজ ফুরফুরে।

বর্তমান সরকারের কাছে কিছু প্রস্তাব রাখা যেতে পারে:—
১) সারা বছর ধরে একই রুটিনে স্কুল না চালিয়ে ‘ওয়েদার- রেসপন্সিভ স্কুল টাইমিং’ চালু করা দরকার। যেমন এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত হোক মর্নিং সেশন আর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত হোক ডে সেশন। বাকী মাসগুলোও ডে অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়েই স্কুল হোক।
২) ব্লকভিত্তিক তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার রিয়েল-টাইম ডেটা দেখে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শককে সময় বদলের স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া হোক।
৩) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রতিটি ক্লাসরুমে তাপ-নিরোধক ছাদ, ক্রস ভেন্টিলেশন এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা আবশ্যিক করা হোক।
প্রচণ্ড গরমে জোর করে স্কুলে বসিয়ে রাখলে আমরা হয়তো হাজিরা খাতা ভরাব, কিন্তু মগজ ভরবে না। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর কথা মাথায় রেখে এবার আমাদের ‘শিশু-কেন্দ্রিক’ ও ‘জলবায়ু বান্ধব’ (‘চাইল্ড-সেন্ট্রিক’ ও ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট’ ) শিক্ষানীতিকে মেনে নেওয়ার সময় এসেছে।
আশা করছি নতুন রাজ্য সরকার এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করবেন এবং লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার স্বার্থের দিকে মনোযোগ দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।