ছেলের ক্রিকেট ব্যাটটা এখনও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন মা জুহি। বিশ্বাসই করতে পারছেন না, স্কুল থেকে ফিরে রোজকার মতো আর ব্যাট হাতে মাঠে ছুটবে না তাঁর ১১ বছরের ছটফটে ছেলে বিহান। কারণ ঘণ্টাখানেক আগেই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্কুল বাস থেকে বের করা হয়েছে তার নিথর দেহ।
মঙ্গলবার দুপুরে চেম্বুরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর এমনই হৃদয়বিদারক ছবি ধরা পড়ল। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ইউনিভার্সাল স্কুলের বাসের উপর আচমকাই ভেঙে পড়ে বিশাল একটি গাছ। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া বিহানের। আহত হয় আরও চার পড়ুয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ছেলের ব্যাট আঁকড়ে পাথরের মতো বসে আছেন জুহি। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে গেলেও তিনি নির্বাক। বারবার শুধু বলছেন, “বিহানকে তো ক্রিকেট খেলতে যেতে হবে, ওকে ডাকো।”
পরিবারের ঘনিষ্ঠ রাজি মালহোত্রা জানালেন, “বিহান খুব মেধাবী, ভদ্র ছেলে ছিল। সারাক্ষণ বলত, বড় হয়ে পেশাদার ক্রিকেটার হব। আমার ছেলে দেবকে বলত, ‘দাদা, আমাকে ক্রিকেট শেখাও’। জুহি ছেলেকে ছাড়া কিছু বুঝত না। স্কুলে গেলেও ভিডিও কল করে খোঁজ নিত। এখনও মানতে পারছে না যে বিহান নেই।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা নাগাদ চেম্বুরের শেল কলোনি এলাকায় ১৩ জন পড়ুয়া নিয়ে যাচ্ছিল বাসটি। প্রবল হাওয়ার মধ্যে আচমকাই রাস্তার ধারের একটি পুরনো গাছ বাসের ছাদের উপর ভেঙে পড়ে। বাসের সামনের অংশ দুমড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বাসের কন্ডাক্টর দ্রুত উদ্ধারকাজে নামেন। জানলা ভেঙে একে একে শিশুদের বের করা হয়। পাঁচজনকে তড়িঘড়ি চেম্বুরের জেন মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বিহানকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের ডিরেক্টর ডা. রয় পাতঙ্কর জানান, “আহত চারজনের মধ্যে তিনজন ছেলে ও একজন মেয়ে। দু’জনের সিটি স্ক্যান-সহ সব পরীক্ষা হয়েছে। সকলের অবস্থা এখন স্থিতিশীল। ভয়ের কিছু নেই।”
ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান মুম্বইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে। নিহত ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, “একজন মা হিসেবে আমি শোকাহত। ১৩ জন শিশুর মধ্যে ১২ জন নিরাপদে আছে, এটুকুই সান্ত্বনা। কিন্তু একটি প্রাণ আমরা বাঁচাতে পারলাম না।” তিনি পুরসভাকে শহরের ঝুঁকিপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
চেম্বুর থানার পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। গাছটি কেন বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল, পুরসভার গাফিলতি আছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একটি ব্যাট, একরাশ স্বপ্ন আর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ — চেম্বুরের রাজপথে পড়ে রইল শুধুই শূন্যতা।