একদিকে কাতারে ফিফা বিশ্বকাপের বল গড়াচ্ছে, গ্যালারি ফেটে পড়ছে গোলের উল্লাসে। আর অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাটি ফুঁড়ে উঠে এল মৃত্যুর হাহাকার। রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১,৪০০, নিখোঁজ আরও হাজার হাজার। এই মৃত্যু-মিছিলেই চাপা পড়ে গেল আর্জেন্টিনার ফুটবলার লুকাস ত্রেহোর গোটা সংসার—স্ত্রী ইয়ানিনা, ছেলে অ্যারন ও মেয়ে আইনহোয়া।
৩৮ বছরের লুকাস ত্রেহো ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ডিভিশন ক্লাব ‘মারিতিমো লা গুয়াইরা’-র নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার। মাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়া যার কাজ, তিনি এবার নিজের পরিবারকেই বাঁচাতে পারলেন না। ভূমিকম্পের সময় ত্রেহো ছিলেন কারাকাসে, দলের প্রশিক্ষণ শিবিরে। ফোনে বিপর্যয়ের খবর পেয়েই বুট খুলে ছুট লাগান লা গুয়াইরার দিকে—যেখানে সমুদ্র-ঘেঁষা ফ্ল্যাটে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান।
কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ১২ তলা ভবনটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ত্রেহো দেখেন, গোটা পাড়াটাই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
স্বজন বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশায় হাত দিয়ে বালি-পাথর সরাতে শুরু করেন ত্রেহো। সঙ্গে যোগ দেন ক্লাবের সতীর্থ ও স্থানীয়রা। ভারী ক্রেন, এক্সক্যাভেটরের জন্য প্রশাসনের কাছে কাকুতি-মিনতি করেও লাভ হয়নি। ৭২ ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী দল একে একে বের করে আনে ইয়ানিনা, ৯ বছরের অ্যারন ও ৫ বছরের আইনহোয়ার নিথর দেহ।
শ্যালক রিকার্ডো আরদিলস বলেন, “লুকাস পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। দেহগুলো বের করার পর ও শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ওর চোখে তখন গোটা দুনিয়া অন্ধকার।”
রবিবার ‘মারিতিমো লা গুয়াইরা’ ক্লাব আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, “আমরা গভীর শোকাহত। লুকাস, তুমি একা নও। এই ক্লাব, এই শহর, এই দেশ তোমার পাশে আছে।” আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও শোকবার্তা পাঠিয়েছে। বিশ্বকাপে খেলতে নামা লিওনেল মেসির দেশের এক যোদ্ধা আজ জীবনের মাঠে সম্পূর্ণ একা।
ভূমিকম্প কেড়ে নিয়েছে ভেনেজুয়েলার যুব আন্তর্জাতিক ফুটবলার ইমভার্ট বেরোতেরানের প্রাণও। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১২ জন পেশাদার ফুটবলার। লা গুয়াইরার স্টেডিয়াম এখন অস্থায়ী মর্গ।
সরকারি হিসেবে এখনও পর্যন্ত ১,৪২৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত ৬,০০০ ছাড়িয়েছে। ধসে পড়েছে ১০ হাজারের বেশি বাড়ি। উপকূলীয় এলাকায় সুনামি-সতর্কতা থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ নেই, পানীয় জল নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে, জরুরি ত্রাণ না পৌঁছলে মৃতের সংখ্যা ৫,০০০ ছাড়াতে পারে।
ত্রেহোর কোচ হুয়ান কার্লোস বলছিলেন, “ও প্রতিদিন অনুশীলনের পর ভিডিও কলে বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক দেখাত। বলত, ‘এবার বিশ্বকাপের পর পরিবার নিয়ে আর্জেন্টিনায় ফিরব’। সেই স্বপ্ন আর ফিরল না।”
বিশ্বকাপের স্কোরবোর্ডে যখন গোলের হিসেব লেখা হচ্ছে, তখন ভেনেজুয়েলায় লেখা হচ্ছে লাশের হিসেব। মাঠের লড়াইয়ে হার-জিত থাকে, কিন্তু নিয়তির কাছে হেরে গিয়ে আজ নিঃস্ব লুকাস ত্রেহো। ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে তিনি এখনও বিড়বিড় করছেন, “ইয়ানিনা, অ্যারন, আইনহোয়া…আমি তো আসছিলাম”।
ফুটবল একদিন তাঁকে বিশ্বচিনিয়েছিল, আজ সেই ফুটবল-দুনিয়াই সাক্ষী থাকল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের।