তামিল চলচ্চিত্রের বরেণ্য পরিচালক, অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার কে ভাগ্যরাজ আর নেই। শনিবার চেন্নাইয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি। রবিবার বেসান্ত নগর শ্মশানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।
শেষযাত্রায় আবেগের জোয়ার:
শবযাত্রা চেন্নাইয়ের রাজপথ ছুঁতেই ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো একবার দেখতে, শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় উপচে পড়ে। সহকর্মী, ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত মুখ থেকে অগণিত অনুরাগী—কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। সকলের কণ্ঠেই ছিল একটাই কথা, “তামিল সিনেমার এক যুগের অবসান হল।”
চলচ্চিত্রের আঙিনায় পথচলা:
ইরোড জেলায় জন্ম নেওয়া কৃষ্ণস্বামী ভাগ্যরাজের সিনেমা-সফর শুরু হয়েছিল কিংবদন্তি পরিচালক ভারতীরাজার সহকারী হিসেবে। ‘১৬ ভায়াতিনিলে’-র মতো ছবিতে জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে পর্দায় দেখা গেলেও, লেখনীতেই ছিল তাঁর আসল শক্তি। ভারতীরাজার ‘কিঝাকে পোগুম রায়িল’ ও ‘টিক টিক টিক’-এর চিত্রনাট্য লিখে নজর কাড়েন। ১৯৭৯ সালে ‘সুভারিল্লাধা চিত্তিরাঙ্গাল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
মধ্যবিত্তের গল্পকার:
আট ও নব্বইয়ের দশকে তামিল সিনেমায় ভাগ্যরাজ মানেই ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, তীক্ষ্ণ সংলাপ আর বাস্তবসম্মত গল্প। ২৫টির বেশি ছবি পরিচালনা ও ৭৫টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘মুন্ধানাই মুদিচু’, ‘অন্ধা ৭ নাটকাল’, ‘ডার্লিং, ডার্লিং, ডার্লিং’-এর মতো কালজয়ী ছবি আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। চিত্রনাট্যের জাদুতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন তামিল সিনেমার অন্যতম সেরা ‘স্ক্রিপ্ট ডক্টর’। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর আবেগ, গভীরতা ও টানটান আখ্যান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে।
এমজিআরের উত্তরসূরি:
তামিল সিনেমায় ভাগ্যরাজের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কিংবদন্তি অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন প্রকাশ্যে তাঁকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
বলিউডেও ছাপ:
শুধু তামিল নয়, হিন্দি ছবিতেও নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে অমিতাভ বচ্চনকে দ্বৈত চরিত্রে নিয়ে পরিচালনা করেন ‘আখরি রাস্তা’। জয়া প্রদা, শ্রীদেবী, অনুপম খের অভিনীত এই প্রতিশোধের গল্প সেই দশকের অন্যতম আলোচিত হিন্দি ছবি হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবন:
ভাগ্যরাজ রেখে গেলেন স্ত্রী অভিনেত্রী পূর্ণিমা ভাগ্যরাজ, পুত্র অভিনেতা শান্তনু ভাগ্যরাজ ও কন্যা সারনিয়া ভাগ্যরাজকে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও তিনি গোয়ায় অভিনেত্রী-রাজনীতিবিদ খুশবু সুন্দরের মেয়ের বিয়েতে হাজির ছিলেন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত মানুষটির আকস্মিক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।
তামিল সিনেমার এই ‘মাস্টার স্টোরিটেলার’-এর চলে যাওয়া শুধু একটি মৃত্যু নয়, একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর কাজ, তাঁর গল্প বলার ঢং দীর্ঘদিন দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।