প্রবল ঝড়বৃষ্টির মাঝেই ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের মাথায় আছড়ে পড়ল বজ্র। কয়েক সেকেন্ডের সেই শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। চারদিক অন্ধকার করে বিদ্যুতের রেখা সোজা গিয়ে ছুঁয়ে ফেলল ৩৩০ মিটার উঁচু লোহার কাঠামোকে। মুহূর্তে আলোয় ভরে গেল প্যারিসের আকাশ।
যেভাবে ঘটল ঘটনা:
গত কয়েকদিন ধরে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে চলছে তীব্র দাবদাহ। গরম, আর্দ্র ও অস্থির বাতাস জন্ম দিচ্ছে শক্তিশালী বজ্রঝড়ের। তারই মধ্যে প্যারিসে নামে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। কালো মেঘে ঢাকা আকাশে তখন ঘনঘন বিদ্যুতের ঝিলিক। হঠাৎই একটি সূক্ষ্ম, উজ্জ্বল রুপোলি রেখা নেমে এসে সরাসরি আঘাত হানে আইফেল টাওয়ারের চূড়ায়। উপস্থিত পর্যটক ও স্থানীয়রা হতবাক হয়ে যান। অনেকেই মোবাইলে ধরে ফেলেন সেই দুর্লভ মুহূর্ত।
আতঙ্কের কিছু নেই, বলছেন বিশেষজ্ঞরা:
দৃশ্যটা দেখে অনেকে ভয় পেলেও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আইফেল টাওয়ারের জন্য এটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং বছরে গড়ে ৫ থেকে ১০ বার সরাসরি বজ্রপাত সহ্য করে এই স্থাপনা। এর মূল কারণ এর উচ্চতা ও ধাতব কাঠামো। উঁচু এবং বিদ্যুৎ পরিবাহী বস্তুই বজ্র আকর্ষণ করে, কারণ মেঘ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে সেটাই সবচেয়ে কম দূরত্বের পথ তৈরি করে।
কীভাবে সুরক্ষিত থাকে আইফেল টাওয়ার?
আইফেল টাওয়ার বজ্রকে ‘টেনে আনে’ না, বরং বজ্রপাতের সময় বিশাল লোহার কাঠামোটি ‘ফ্যারাডে কেজ’ হিসেবে কাজ করে। পদার্থবিদ মাইকেল ফ্যারাডের এই নীতি অনুযায়ী, ধাতব খাঁচার ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে ভিতরে থাকা মানুষ বা যন্ত্রপাতির কোনও ক্ষতি হয় না। বজ্রপাতের বিপুল শক্তি টাওয়ারের কাঠামো বেয়ে নেমে যায়।
টাওয়ারের পাদদেশে রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা। এটি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভোল্ট বিদ্যুৎকে নিরাপদে মাটির গভীরে পাঠিয়ে দেয়। পাশাপাশি আধুনিক ‘সার্জ প্রোটেকশন’ প্রযুক্তি লিফট, আলোকসজ্জা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে রক্ষা করে। তাই বজ্রপাত হলেও কাঠামোর কোনও ক্ষতি হয় না।
পর্যটকদের নিরাপত্তা:
আবহাওয়া দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে টাওয়ার কর্তৃপক্ষ সবসময় নজরদারি চালায়। প্রবল দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে টাওয়ারের উপরের অংশ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। তবে বজ্রপাতের কারণে কাঠামোগত ক্ষতির নজির নেই বললেই চলে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব?
এবারের বজ্রপাত এমন সময় হল যখন ইউরোপের বড় অংশ তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে। উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে, ফলে তৈরি হয় ভয়াবহ বজ্রঝড়। ঘনঘন বজ্রপাতও তারই ফল। দৃশ্যটা যতই ভয়ঙ্কর লাগুক, সুপরিকল্পিত সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে আইফেল টাওয়ার বরাবরের মতোই অক্ষত, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্যারিসের বুকে।