_এনসিইআরটি-র নবম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নতুন পাঠ্যবই নিয়ে ফের বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অভিযোগ, সংবিধানের সম্পূর্ণ প্রস্তাবনা, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে ‘মনুস্মৃতি’র শ্লোক ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা।
বাদ গেল মুখবন্ধ, নেই ‘Secular’ শব্দের উল্লেখ :
_আগের পাঠ্যবইয়ে সংবিধানের সম্পূর্ণ মুখবন্ধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে ‘Sovereign’, ‘Socialist’, ‘Secular’, ‘Republic’, ‘Democratic’ – রাষ্ট্রের এই পাঁচটি মূল ভিত্তির আলাদা করে অর্থও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ‘Secularism’ বলতে বোঝানো হয়েছিল, রাষ্ট্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মকে অগ্রাধিকার দেবে না, বরং সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দেবে।
_নতুন সংস্করণে সংবিধানের পুরো প্রস্তাবনা বাদ পড়েছে। ‘Secular’ বা ‘Secularism’ শব্দের কোনও উল্লেখই নেই। পরবর্তী শ্রেণির বইয়ে এই বিষয়গুলি থাকবে কি না, সে বিষয়েও কোনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা নিয়ে প্রশ্ন :
_আগের বইয়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার ও তাদের ক্ষমতার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। নতুন বইয়ে একটি পূর্ণ অধ্যায় রাখা হয়েছে নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা, নথিভুক্তকরণ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে।
_সেখানে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, যোগ্য নাগরিক যাতে তালিকা থেকে বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ যাতে ঢুকে না পড়েন, সেটাই SIR-এর লক্ষ্য। নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা করে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুয়ো খবর, অপতথ্য ও ভীতি প্রদর্শনের মতো বাধা পেরিয়েও কমিশন নিরপেক্ষভাবে ভোট করায়। SIR নিয়ে আগে থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক থাকায় পাঠ্যবইয়ের এই অংশ ঘিরেও নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে ‘মনুস্মৃতি’, বর্ণব্যবস্থার নতুন ব্যাখ্যা :
_সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ‘মনুস্মৃতি’র উল্লেখ নিয়ে। প্রাচীন ভারতে নারীর অবস্থান বোঝাতে ‘মনুস্মৃতি’র শ্লোক তুলে ধরে বলা হয়েছে, বৈদিক যুগে মহিলারা সম্মান পেতেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারীর সামাজিক অবস্থানেরও উত্থান-পতন ঘটেছে।
_বর্ণ ও জাতি সংক্রান্ত অধ্যায়ে দাবি করা হয়েছে, বৈদিক যুগে সামাজিক পরিচয় জন্মের উপর নির্ভর করত না। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য অনুযায়ী, পেশা, জাতিসত্তা, অঞ্চল, ভাষা ও সংস্কৃতিই ছিল সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তি। ‘ঋগ্বেদ’ ও বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘সুতা-নিপাতা’র উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে কেউ ছোট জাতের হয় না। কর্মই মানুষের সামাজিক পরিচয় গড়ে তোলে। ব্রাহ্মণ তাঁর কর্মের মাধ্যমেই ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠেন। আন্তঃবিবাহ, আঞ্চলিক ভিন্নতা ও নতুন পেশার উদ্ভবের ফলেই জাতিব্যবস্থা জটিল আকার নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে পাঠ্যক্রম সংস্কার :
_সমালোচকদের মতে, সংবিধানের মূল ভিত্তি ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো বিষয় বাদ দিয়ে ‘মনুস্মৃতি’ ও বিতর্কিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রশংসা যুক্ত করা পাঠ্যক্রমকে একপেশে করে তুলছে। সমর্থকদের পাল্টা যুক্তি, প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য ও বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
_এনসিইআরটি-র পাঠ্যবই সংস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সংবিধানের মুখবন্ধ বাদ ও ‘মনুস্মৃতি’র অন্তর্ভুক্তি এবারের বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।