স্যাঁটা গরম’ মন্তব্যে বিতর্কে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় : শিক্ষক মহলে সমালোচনার ঝড়
কলেজে ভর্তিতে ঘুষ-দুর্নীতি রুখতে কড়া বার্তা দিতে গিয়ে বিতর্কে জড়ালেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, “কলেজে ভর্তির জন্য যদি কোথাও টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আসে, তাহলে সে যে দলের লোক হোক না কেন তার স্যাঁটা গরম করে দেওয়া হবে।” মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর থেকেই শিক্ষক মহল ও সুশীল সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।শুক্রবার রাতে একটি টক-শো অনুষ্ঠানে রাজ্যের কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সময় মন্ত্রী বলেন, “আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছি। ভর্তির নামে যদি কোনো অধ্যক্ষ, অধ্যাপক বা ছাত্রনেতা টাকা তোলে, অভিযোগ প্রমাণ হলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। সে যে দলের লোক হোক না কেন তার স্যাঁটা গরম করে দেওয়া হবে।” মন্ত্রীর এই মন্তব্যের ক্লিপ রাতারাতি ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।তাঁর এই মন্তব্য নিয়ে শিক্ষক মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।মন্ত্রীর মুখে ‘স্যাঁটা গরম’ শব্দবন্ধ ব্যবহারে ক্ষুব্ধ শিক্ষক সংগঠনগুলি। পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (WBCUTA)-এর সাধারণ সম্পাদক ড. সৌমিত্র বসু বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু একজন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর মুখে এই ধরনের অসংসদীয়, হুমকির ভাষা কাম্য নয়। উচ্চশিক্ষা দপ্তর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারক। মন্ত্রীর ভাষা যদি রাস্তার মস্তানের মতো হয়, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের কাছে কী বার্তা যাবে?”যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঘুষ নেওয়া অপরাধ, তার জন্য আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে। ‘স্যাঁটা গরম’ করে দেওয়া কোনো প্রশাসনিক ভাষা নয়। একজন মন্ত্রী আইনের কথা বলবেন, পেশিশক্তির নয়।”বিরোধী দলনেতা কটাক্ষ করে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী থেকে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী— সবার মুখেই এখন ‘গরম’ করার কথা। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার হাল বোঝাই যাচ্ছে। যিনি নিজের দপ্তরের অধ্যাপকদের সম্মান দিতে জানেন না, তিনি দুর্নীতি রুখবেন কী করে?”শাসক দলের মুখপাত্র অবশ্য মন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “মন্ত্রী আবেগের বশে গ্রাম্য ভাষায় কথা বলেছেন। এর অর্থ হল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিরোধীরা অহেতুক ইস্যু তৈরি করছে। মন্ত্রী কোনো শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে বলেননি, বলেছেন দুর্নীতিবাজদের।”প্রশ্নের মুখে মন্ত্রীর শব্দচয়ন। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন আজ থেকেই যদি উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রীর এমন বক্তব্য হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে? প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেওয়া জরুরি, কিন্তু মন্ত্রীর পদমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করাও সমান জরুরি। ‘স্যাঁটা গরম’ শব্দবন্ধটি বাংলায় হুমকি ও শারীরিক নিগ্রহের অর্থে ব্যবহৃত হয়। উচ্চশিক্ষার মতো একটি স্পর্শকাতর দপ্তরের মন্ত্রীর মুখে এই শব্দ নিয়ে তাই বিতর্ক থামছে না। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর মন্তব্য নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি বা দুঃখপ্রকাশ করেননি। দপ্তরের তরফেও কোনো বিবৃতি জারি হয়নি।ভর্তি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে সরকার অনলাইন সেন্ট্রালাইজড অ্যাডমিশন পোর্টাল চালু করেছে। তার মধ্যেই মন্ত্রীর এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিল। এখন দেখার, ‘স্যাঁটা গরম’ বিতর্কের আঁচ কতদূর গড়ায়।