_কুমেরু হোক বা সুমেরু—পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলই রহস্যে মোড়া। বরফের সাদা চাদরের নিচে কী লুকিয়ে আছে, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। উপগ্রহ চিত্র, রাডার এবং ভূ-পদার্থবিদ্যার নানা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে সেই অজানা সাম্রাজ্য। সম্প্রতি তেমনই এক চমকপ্রদ আবিষ্কার সামনে এসেছে—পূর্ব কুমেরুর প্রায় ২ কিলোমিটার পুরু বরফের নিচে বিজ্ঞানীরা খোঁজ পেয়েছেন একটি প্রাচীন নদী ব্যবস্থার। যার বয়স শুনলে হতবাক হতে হয়—প্রায় ২ কোটি বছর।
কীভাবে পাওয়া গেল এই নদীর খোঁজ:—
_বরফের ২ কিলোমিটার নিচে চোখে দেখা বা ড্রিল করে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে কানাডার ‘RADARSAT’ কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। উপগ্রহ থেকে পাঠানো রাডার তরঙ্গ বরফ ভেদ করে নিচের ভূ-প্রকৃতির ছবি তুলে আনে। সেই ছবি বিশ্লেষণ করেই ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ‘প্রিন্সেস এলিজাবেথ ল্যান্ড’ অঞ্চলের নিচে একটি বিশাল নদী অববাহিকার সুস্পষ্ট চিহ্ন পান।
_রাডার ডেটায় দেখা গেছে, বরফের নিচে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপত্যকা চলে গেছে। যার গঠন দেখে বোঝা যায় এটি কোনো হিমবাহের তৈরি নয়, বরং বহু প্রাচীন নদীর তৈরি ‘V’ আকৃতির উপত্যকা। নদীটি একসময় সমুদ্রে গিয়ে মিশত। এখন সেই পুরো অববাহিকা ২ কিমি পুরু বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে।
দুই কোটি বছর আগের কুমেরু: বরফ নয়, ছিল সবুজ অরণ্য:—
_আজকের কুমেরুকে আমরা চিনি ধূ ধূ বরফের মরুভূমি হিসেবে। গড় তাপমাত্রা -৫৭°C, বছরে বৃষ্টিপাত হয় মাত্র ৫০ মিমি। কিন্তু ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে থেকে ১ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ মায়োসিন যুগে, কুমেরুর ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
_তখন অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো দক্ষিণ মেরুতে একা বিচ্ছিন্ন ছিল না। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার সাথে যুক্ত ছিল। উষ্ণ সমুদ্রস্রোত ঢুকত, তাই জলবায়ু ছিল নাতিশীতোষ্ণ। বিজ্ঞানীদের মতে, তখন গড় তাপমাত্রা ছিল ১২-১৫°C। উপকূল অঞ্চলে ঘন ‘সাউদার্ন বিচ’ এবং ‘পডোকার্প’ গাছের জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে যেত অসংখ্য নদী। সেই নদীর ধারেই ঘুরে বেড়াত মার্সুপিয়াল জাতীয় স্তন্যপায়ী, বিশালাকার পাখি এবং উভচর প্রাণী। জীবাশ্ম প্রমাণ বলছে, তখন কুমেরুতে ‘ক্রাইওলোফোসরাস’ নামে ডাইনোসরও ছিল, যদিও এই নদীটি তারও পরের যুগের।
বরফ কীভাবে গ্রাস করল এই নদীকে:—
_প্রায় ২ কোটি বছর আগে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ঠান্ডা বাড়তে শুরু করে। অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে ‘ড্রেক প্যাসেজ’ খুলে যায়। ফলে ‘অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার কারেন্ট’ তৈরি হয়। এই শক্তিশালী সমুদ্রস্রোত কুমেরুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং উষ্ণ জল ঢুকতে বাধা দেয়। কুমেরু ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও ঠান্ডা হতে থাকে।
_প্রথমে উঁচু পাহাড়ের মাথায় হিমবাহ জমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই হিমবাহ গড়িয়ে নেমে উপত্যকা, নদী, জঙ্গল—সবকিছু ঢেকে দেয়। ১ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে গোটা মহাদেশটাই প্রায় ২-৩ কিমি পুরু বরফের তলায় চলে যায়। সেই সময়ই এই নদীটিও বরফের নিচে সমাধিস্থ হয়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত নদীটি সূর্যের আলো দেখেনি।
এই আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ:—
১. অতীতের জলবায়ু বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা:—-
_এই নদী প্রমাণ করে, কুমেরু একসময় কতটা উষ্ণ ও প্রাণবন্ত ছিল। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলছে। অতীতে কীভাবে বরফ তৈরি হয়েছিল এবং গলেছিল, তা বুঝলে ভবিষ্যতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া সহজ হবে।
২. উপ-হিমবাহী জলের গতিপ্রকৃতি: —-
_বরফের নিচে এখনও তরল জলের নদী, হ্রদ আছে। এই প্রাচীন উপত্যকাগুলোই এখনকার ‘সাবগ্লেশিয়াল’ জলের প্রবাহপথ। এই জল বরফের পাতের তলদেশ পিচ্ছিল করে হিমবাহের গতি বাড়িয়ে দেয়। ফলে বরফ দ্রুত সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এই নদীখাত ম্যাপিং করলে কুমেরুর বরফ কত দ্রুত গলবে তার মডেল তৈরি হবে।
৩. প্রাণের সন্ধান: —-
_পৃথিবীর সবচেয়ে চরম পরিবেশেও প্রাণ টিকে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বরফের নিচের এই প্রাচীন নদীখাতে বা হ্রদে অণুজীব আটকা পড়ে থাকতে পারে। ২ কোটি বছর ধরে সূর্যের আলো-বাতাস ছাড়া তারা কীভাবে বেঁচে আছে, তা জানা গেলে মঙ্গল গ্রহ বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপায় প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন দিশা মিলবে।
সামনে কী আছে ?—–
_আপাতত উপগ্রহ ও রাডারই ভরসা। তবে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা ‘সাবগ্লেশিয়াল অ্যাক্সেস ড্রিলিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২ কিমি বরফ ফুঁড়ে এই নদী অববাহিকা থেকে পলি তুলে আনতে চান। সেই পলিতে আটকে আছে ২ কোটি বছর আগের পরাগরেণু, গাছের ডাল, এমনকি প্রাণীর DNA। তা বিশ্লেষণ করলেই হুবহু ছবি পাওয়া যাবে—সেই হারানো সবুজ কুমেরু আসলে কেমন ছিল।
_কুমেরুর বরফ কোনো স্থির, মৃত জগৎ নয়। তার তলায় ঘুমিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাস। ২ কোটি বছরের প্রাচীন এই নদী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর জলবায়ু কতটা পরিবর্তনশীল। আজ যা বরফে ঢাকা মরুভূমি, কাল তা-ই ছিল প্রাণচঞ্চল অরণ্য। আবার আগামীতে কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আমাদের উপর। বরফের নিচের এই নদী তাই শুধু অতীতের গল্প নয়, ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবার্তাও। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, কুমেরুর বুকে এখনও কত অজানা অধ্যায় লুকিয়ে আছে, যা খুলতে পারলে পৃথিবীর জন্ম থেকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অনেক অঙ্ক মিলে যাবে।