
অলকেশ মাইতি: রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা কাহিনীর কোন শেষ নেই। বিশেষ করে একাধিক বাঙালি ও বিদেশী নারী সম্পর্ক পাঠককুলকে যে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এঁদের মধ্যে স্পেনের কবি ও কিছু রবীন্দ্রনাথ রচনার স্পেনীয় ভাষার অনুবাদক জেনোবিয়া ক্যাম্প্রবি এবং জার্মানির হেলেন মেয়ের ফ্রাঙ্ক, হাঙ্গেরিয়ার চিত্রশিল্পী এলিজাবেথ ব্রুনার ,প্যারিসের আঁদ্রে কাহপেলে খুবই উল্লেখযোগ্য নাম। কিন্তু কবি গুরুর জীবনের শেষ ১৭ বছর যাঁর সান্নিধ্য সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় ,যাঁর সঙ্গে অন্তত ১৫ বছর ধরে কবিগুরুর চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়েছে, যাঁকে নিয়ে চর্চা ফুরোয় না, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যাঁর ভাবনা অকূল তিনি হলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। কে এই ওকাম্পো? কীভাবে কবিগুরুর নামের সাথে তাঁর নাম জুড়ে গেল— এই প্রসঙ্গেই আসছি। প্রথমেই বলে রাখি পারিবারিক জীবনে অকাম্পো কিন্তু ১৯২২সাল থেকে বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী জীবন যাপন করেন । অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথও ৪১ বছর বয়স থেকে বিপত্নীক ছিলেন। এমনই এক পরিস্থিতিতে ৩৪ বছর বয়সি ওকাম্পোর সাথে ১৯২৪ সালের নভেম্বর মাসে ৬৩ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ হয় বুয়েন্স আয়ার্সে। রবীন্দ্রনাথ তখন পেরু ও মেক্সিকোতে যাওয়ার পথেই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হলেন এবং কোনো উপায় না থাকায় পাশাপাশি বুয়েন্স আয়ার্সের ‘প্লাজা হোটেলে’ অবস্থান করছিলেন। কবির চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেন কোনো পল্লী এলাকায় কবিকে নিয়ে গিয়ে নিরিবিলি স্থানে বিশ্রাম করানোর জন্য। এমন সময় নাটকীয় ভাবে ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথের এই শারীরিক পরিস্থিতির খবর পেয়ে ছুটে এলেন বুয়েন্স আয়ার্সের ‘প্লাজা হোটেল’-এ। সেখান থেকে কবির সহযাত্রীদের বুঝিয়ে তিনি কবিকে নিয়ে চলে গেলেন মিরালরিও নামে একটি ছোট্ট গ্রামের নদীর ধারে। ওকাম্পো তাঁর এক আত্মীয়ের কাছ থেকে নদীর ধারে একটি প্রাসাদোপম বাগান বাড়ি ভাড়া নিয়ে কবিকে এবং তাঁর সেক্রেটারিকে দুই মাস ধরে সযত্নে রেখেছিলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি লাতিন আমেরিকা যাত্রাকালে রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি ও ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন লিওনার্দ এলমহার্স্ট নামক এক ইংরেজ যুবক। ওকাম্পো কিন্তু প্রতিদিনই শারীরিক খবর নেওয়ার জন্য কবির সাথে দেখা করতে আসতেন এবং একই সাথে বসে কত গল্পও করতেন, কবিতা দেখতেন এবং সঙ্গে খাওয়ার খেতেন। একসময় আর্থিক সমস্যার কারণে অকাম্পো তাঁর এক হীরক খচিত প্রিয় টায়রা পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন কবির আতিথেয়তার কারণে। শুধু তাই নয় ১৯২৫ এর জানুয়ারি মাসে তাঁদের ইউরোপ প্রত্যাবর্তনের সমস্ত খরচও বহন করেছিলেন ওকাম্পো। এতসব দেখে শুনে মনে হচ্ছে –‘এ তো নির্ঘাত প্রেম !’ কিন্তু কেন এই প্রেম ? এ কী কেবল সাহিত্য অনুরাগের, নাকি সুপ্ত রোমান্টিক আবেগের ? রবীন্দ্রনাথ তো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপাদমস্তক খুব রোমান্টিক ছিলেন।তবে আমার চোখে কিন্তু সাহিত্যের টানেই রবীন্দ্র আকর্ষণী-ই তাঁকে কবির খুব নিকটে টেনে নিয়ে যায় বলে মনে হয়। তাঁর রবীন্দ্র টানটা ছিল ভীষণ গাঢ় ও অকৃত্রিম, তাই বিশ্ব দরবারে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর পরই ১৯১৪ সালে ‘ গীতাঞ্জলি’র ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই সেই বই সংগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ পড়ে ফেলেছিলেন ওকাম্পো। তারপর থেকেই কবির সাথে দেখা করবার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা তিনি করেছিলেন। গোড়া থেকেই সাহিত্য বিষয়ে এবং সাহিত্য আলোচনা বিষয়ে ওকাম্পোর বিরাট আগ্রহ ছিল। তাই ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের কবিতাগুলো পড়ে তিনি তো একটি প্রবন্ধ পর্যন্ত লিখেছিলেন ‘দি জয় অফ রিডিং টেগর’ শিরোনামে।
কবির সাথে ওকাম্পোর বয়সের পার্থক্য ছিল প্রায় ৩০ বছরের। বলতে গেলে কবি ছিলেন তাঁর বাবার বয়সী। আর সেই দিক থেকে দেখতে গেলে কবির প্রতি এক ধরনের ভক্তি শ্রদ্ধাবোধ এবং যত্নশীল মনোভাব ছিল তাঁর মধ্যে। কবিও ওকাম্পোর সাহচর্য বেশ উপভোগ করতেন। তবে দুজনের এই সাহচর্য, এই বন্ধুত্ব কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না কবির সফর সঙ্গী সেক্রেটারি এলমহার্স্ট। পরবর্তী একটা সময়ে এলমহার্স্টকে খুব ঈর্ষান্বিত হতেও দেখা যায় , কিন্তু কবিমনে যে ওকাম্পো অবারিত হয়ে আছেন, তা অন্য কারোরই দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার নয়। ১৯২৫ সালে ওকাম্পোর সান্নিধ্যেই কবির ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়। এই কাব্যের কবিতাগুলি পড়লেই বোঝা যায় ওকাম্পোর প্রতি কবির কী তীব্র আকর্ষণই না ছিল।
“দুইদিন পরে
চলে যাব দেশান্তরে,
তখন দূরের টানে স্বপ্নে আমি হব তব চেনা
মোরে ভুলিবে না। “
ভিলা ওকাম্পোতে অবস্থানকালে যে চেয়ারটি কবিকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন ওকাম্পো, সেটি কবিকে বিদায় দেওয়ার সময় উপহার হিসেবে তুলে দেন তিনি। গভীর অনুভব ও সান্নিধ্যের পরিসরের মধ্য দিয়ে বিশ্বের কবিগুরু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে সেই আর্মচেয়ার সযত্নে ব্যবহার করে গেছেন।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য জীবনের শেষ পর্বে ওকাম্পোর অবদান ছিল বিরাট। রবীন্দ্রনাথকে চিত্রশিল্পী হতে উৎসাহ দান থেকে ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য চরিত্র এবং পূরবী কাব্যের অসংখ্য কবিতায় ওকাম্পোর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।১৯৩০ সালে ফ্রান্সে শেষবারের জন্য কবির সাথে ওকাম্পোর দেখা হয়েছিল, যেখানে তিনি কবির চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ঐসময় কবি তাঁকে শান্তিনিকেতনে এসে পাকাপাকিভাবে থাকবার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু ওকাম্পো তাতে রাজি হননি অথচ জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত তিনি কাটিয়ে দিয়েছিলেন সেই ‘ভিলা ওকাম্পো’তেই, যেখানে কবিগুরু তাঁর অতিথি হয়ে উঠেছিলেন, আর অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথও শান্তিনিকেতনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই আর্মচেয়ারটি ব্যবহার ক’রে গেছেন, যা তাঁকে ‘বিজয়া’ উপহার হিসেবে তুলে দিয়েছিলেন । স্প্যানিশ শব্দ ‘ভিক্টোরিয়া’র বাংলা অর্থ হল ‘বিজয়া’। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ওকাম্পোকে ‘বিজয়া’ নামেই ডাকতেন।