নেপালে বাইক নিয়ে ঘুরতে গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি, লরির ধাক্কায় প্রাণ গেল হাওড়ার যুবক সুমনের — কফিনবন্দি হয়ে ফিরল দেহ, শোকস্তব্ধ পরিবার
পাহাড়ের বুকে বাইক ছোটানোর নেশাই কাল হল। নেপালে বাইক ট্রিপে গিয়ে লরির ধাক্কায় মৃত্যু হল হাওড়ার ডোমজুড়ের যুবক সুমন দাসের। সোমবার বিকেলে নেপালের পোখরা-কাঠমান্ডু হাইওয়ের মুগলিং এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। মঙ্গলবার রাতে শিলিগুড়ি হয়ে কফিনবন্দি দেহ এসে পৌঁছয় হাওড়ার নিশ্চিন্দার বাড়িতে। ছেলের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা।
পরিবার ও বন্ধুদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৮ বছরের সুমন পেশায় বেসরকারি সংস্থার কর্মী। বাইক রাইডিং ছিল তাঁর প্যাশন। গত ২৬ জুন হাওড়ার আরও চার বন্ধুর সঙ্গে রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে নেপালের উদ্দেশে রওনা দেন। পোখরা, কাঠমান্ডু ঘুরে ১ জুলাই বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
সোমবার বিকেলে পোখরা থেকে কাঠমান্ডুর দিকে যাওয়ার সময় মুগলিংয়ের কাছে একটি বাঁকে উল্টোদিক থেকে আসা পণ্যবাহী লরির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় সুমনের বাইকের। হেলমেট থাকলেও মাথায় ও বুকে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। সঙ্গে থাকা বন্ধুরা সামান্য আহত হন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই নেপাল পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে নামেন। সুমনকে মুগলিংয়ের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় ও নেপাল পুলিশের তৎপরতায় মঙ্গলবার সকালে পোস্টমর্টেমের পর দেহ ভারতে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
রাত ১০টা নাগাদ শিলিগুড়ি হয়ে সড়কপথে দেহ এসে পৌঁছয় ডোমজুড়ের নিশ্চিন্দায়। খবর ছড়াতেই এলাকায় শোকের ছায়া নামে। রাতেই বাড়ির উঠোনে ভিড় জমান প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা।
বাবা সুকুমার দাস কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “বারবার বারণ করেছিলাম, পাহাড়ি রাস্তা, বাইক নিয়ে যাস না। শুনল না। বলল, ‘বাবা, একবারই তো জীবন। ঘুরে আসি।’ সেই ঘোরাই ওর শেষ ঘোরা হয়ে গেল।” মা মিতা দাস ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন।
সুমনের বন্ধু রাহুল মান্না জানান, “খুব সাবধানে বাইক চালাত সুমন। ওই বাঁকটা খুব বিপজ্জনক ছিল। উল্টোদিক থেকে লরিটা প্রচণ্ড জোরে চলে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।”
বুধবার সকালে হাওড়ার বাঁধাঘাট শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপস্থিত ছিলেন ডোমজুড়ের বিধায়ক কল্যাণ ঘোষ-সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বিধায়ক পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ডোমজুড় থানার পুলিশ জানিয়েছে, নেপাল পুলিশ দুর্ঘটনার তদন্ত করছে। লরিচালককে আটক করা হয়েছে। নেপালের রাস্তায় ভারতীয় বাইক নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম মানতে হয়, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলছে প্রশাসন।
সুমন ‘হাওড়া রাইডার্স ক্লাব’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের বিভিন্ন বাইকার গ্রুপের সদস্যরা। পাহাড়ি রাস্তায় বাইক চালানোর সময় অতিরিক্ত সতর্কতা ও স্থানীয় নিয়ম মেনে চলার আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা।
একটি শখ, একটু অ্যাডভেঞ্চারের নেশা, আর ফিরে এল নিথর দেহ। সুমনের অকাল প্রয়াণ মনে করিয়ে দিল, পাহাড় সুন্দর, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সতর্ক না থাকলে তা প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে।