শনিবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকার ‘শাস্তি’। সোমবার গেট থেকেই ফিরিয়ে দিল স্কুল। অপমান আর অভিমান নিয়ে বাড়ি না ফিরে দামোদরের পাড়ে চলে গেল ৮ বন্ধু। ক্রিকেট ব্যাট হাতে কিছুক্ষণ দাপাদাপি, তারপর গরম থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ। সেই ঝাঁপই শেষ ঝাঁপ হল কুলটির নিয়ামতপুরের তিন কিশোরের। বর্ষার দামোদরের টানে তলিয়ে গেল তিনটি তরতাজা প্রাণ। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও ফেরানো গেল না।
মৃত তিনজনই নিয়ামতপুরের এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। বয়স ১৫-১৬। সহপাঠী ও পরিবারের দাবি, শনিবার ব্যক্তিগত কারণে তারা স্কুলে যায়নি। সোমবার ইউনিফর্ম পরে যথারীতি স্কুলে যায়। অভিযোগ, গেটেই তাদের আটকে দেন নিরাপত্তারক্ষী। প্রধানশিক্ষকের নির্দেশ—শনিবার অনুপস্থিত ৮ জনকে ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না, অভিভাবক ছাড়া কথা নয়।
অপমানে বাড়ি ফিরতে চায়নি ওরা। উল্টে কুলটির ডিসেরগড় ঘাট সংলগ্ন দামোদরের চরে চলে যায় ক্রিকেট খেলতে। প্রত্যক্ষদর্শী বন্ধুদের কথায়, “প্রচণ্ড গরম ছিল। খেলার মাঝে রোহিত বলল, চল নদীতে ডুব দিয়ে আসি।” রোহিত, সায়ন ও অভিষেক—তিনজনই জামা খুলে নেমে পড়ে। দামোদরে তখন ভরা বর্ষার স্রোত। পাড় ঘেঁষে নামলেও হঠাৎ পায়ের তলার বালি সরে যায়। টাল সামলাতে না পেরে তিনজনই গভীরে তলিয়ে যায়।
চিৎকার শুনে ছুটে আসেন নদী-পাড়ের জেলে ও স্থানীয় যুবকরা। প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় অচৈতন্য অবস্থায় তিনজনকে তোলা হয়। তড়িঘড়ি টোটোতে করে আসানসোল জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
মৃতদের নাম—১. রোহিত বাউরি, ২. সায়ন মণ্ডল, ৩. অভিষেক সিং। তিনজনই নিয়ামতপুর ফাঁড়ি এলাকার বাসিন্দা।
খবর পৌঁছতেই হাসপাতালে আছড়ে পড়ে স্বজনদের কান্না। রোহিতের মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। “আমার ছেলেটা সকালে ভাত খেয়ে স্কুল গেল…বলল, টিফিনে ফুচকা খাব”, বিলাপ করছিলেন সায়নের বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি সুকুমার মণ্ডল। পাড়ায় শ্মশানের নিস্তব্ধতা। সন্ধ্যায় তিন বন্ধুর নিথর দেহ একসঙ্গে বাড়ি ফিরলে কান্নার রোল ওঠে গোটা এলাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্কুলে ঢুকতে দিলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না। “শাস্তি দিতে হলে গার্জেন ডাকো, ক্লাসের বাইরে দাঁড় করাও। কিন্তু গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া কোন নিয়ম?” প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবকরা।
কুলটি থানার পুলিশ জানিয়েছে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্কুলের প্রধানশিক্ষক সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি। ফোনে শুধু বলেছেন, “আমরা মর্মাহত। তবে নিয়ম অনুযায়ী অভিভাবক ছাড়া অনুপস্থিত ছাত্রদের ক্লাসে নিই না। ওরা কোথায় গেছে, জানতাম না।”
জেলা স্কুল পরিদর্শক জানান, “বেসরকারি স্কুল হলেও ছাত্রকে স্কুল চলাকালীন রাস্তায় বের করে দেওয়া যায় না। গোটা ঘটনার রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। দোষ প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিসেরগড় ঘাটে কোনও সতর্কবোর্ড নেই, নেই উদ্ধারকারী দল। স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, “প্রতি বর্ষায় এখানে ২-১টা ঘটনা ঘটে। প্রশাসনকে বহুবার বলেছি, গার্ডওয়াল ও লাইফগার্ড দিতে।”
শনিবার স্কুল কামাইয়ের ‘অপরাধে’ সোমবার জীবন দিয়েই চরম মূল্য চোকাল তিন কিশোর। তাদের বইখাতা পড়ে রইল টেবিলে, ব্যাট পড়ে রইল দামোদরের চরে। নিয়মের গেরোয় প্রাণ গেল, না সচেতনতার অভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা কুলটি।
আপাতত নিয়ামতপুরের আকাশ ভারী। তিন বন্ধুর সাইকেল স্ট্যান্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, যেন স্কুল ছুটির অপেক্ষায়। কিন্তু ছুটি আর হবে না।