কথামুখ:—_প্রতি বছর ২১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক যোগা দিবস’। শরীর ও মনের সমন্বয়ে সুস্থ জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে ২০১৪ সালে রাষ্ট্রসংঘে ভারতের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির উদ্যোগে ১৭৭টি দেশের সমর্থনে দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। নিরবিচ্ছিন্নভাবে এখনও পর্যন্ত এই দিন উদযাপিত হয়ে আসছে সারা বিশ্বে। ভারতের কাছে এ এক বিরাট প্রাপ্তি , ১৭৭ টি দেশের স্বীকৃতি অবশ্যই একটি সর্বোচ্চ সম্মান।
এবারের থিম:
_২০২৬ সালের থিম— ‘যোগা ফর হেলদি এজিং’ অর্থাৎ ‘সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ে। নিয়মিত যোগাভ্যাস এই সমস্যা কমিয়ে কর্মক্ষম ও আনন্দময় বার্ধক্য উপহার দিতে পারে—এই বার্তাই ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য।
কেন ২১ জুন:
_২১ জুন কোনো বিশেষ ব্যক্তির জন্মদিবস হিসেবে যোগা দিবস পালিত হয় এমনটা নয়। আসল কারণটি হলো — উত্তর গোলার্ধে বছরের দীর্ঘতম দিন ২১ জুন। যোগিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিনে আদিযোগী শিব প্রথম মানবজাতিকে যোগ শিক্ষা দিয়েছেন বলে প্রচলিত ও পৌরাণিক শাস্ত্রীয় ধারণা। তাই দিনটি ‘আন্তর্জাতিক যোগা দিবস’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন:
_২০২৬ কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্র ধরা হয়েছে কলকাতার রেড রোড। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ একসঙ্গে যোগাভ্যাস করবেন। সকাল ৬.৩০টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে সাধারণ যোগ প্রোটোকলের ২১টি আসন, প্রাণায়াম ও ধ্যান করানো হবে। অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন সেনা, নৌবাহিনী, এনসিসি ক্যাডেট, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও প্রবীণ নাগরিকরা। _রাজ্য সরকার এদিন রাজ্যের সমস্ত সরকারি কর্মচারীর জন্য যোগাভ্যাসে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে। দপ্তর, আবাসন অথবা রেড রোডে সকাল ৬.৩০টা থেকে ৭.৪৫টা পর্যন্ত যোগাভ্যাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনদিনের কর্মসূচি:
_যোগ দিবসকে ঘিরে কলকাতায় তিনদিনের উৎসব আয়োজিত হয়েছে। প্রথম দিন ৩ কিমি ‘যোগা ম্যারাথন’, দ্বিতীয় দিন কার্নিভালে অঙ্কন, নৃত্য, যোগাসন প্রতিযোগিতা ও ড্রোন লাইট শো এবং তৃতীয় দিন মূল অনুষ্ঠান। ফুড কোর্টে ছিল মিলেট-ভিত্তিক স্বাস্থ্যকর খাবার।
বিশ্বজুড়ে পালন:
_নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরের লনে ১৮০টি দেশের প্রতিনিধি যোগ করবেন। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ার, দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা চত্বর, জাপানের মাউন্ট ফুজির পাদদেশেও হাজারো মানুষ যোগাভ্যাসে সামিল হবেন। ভারতীয় দূতাবাসগুলি প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে বিশেষ শিবির করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যোগের উপকারিতা:
_১. শারীরিক: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণ, মেরুদণ্ড ও জয়েন্টের নমনীয়তা বাড়ায়।
_২. মানসিক: উদ্বেগ, অবসাদ কমায়, মনঃসংযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, ঘুমের উন্নতি করে।
_৩. বার্ধক্যে: হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখে, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়, একাকিত্ব দূর করে।
_বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, নিয়মিত ৩০ মিনিট যোগাভ্যাস ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপ ৪০% পর্যন্ত কমাতে পারে।
সরকারি উদ্যোগ: _আয়ুষ মন্ত্রকের ‘যোগা অ্যাট হোম, যোগা উইথ ফ্যামিলি’ ক্যাম্পেইন, ‘নমস্তে যোগা’ অ্যাপ, স্কুলে যোগ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রেল, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কর্পোরেট সংস্থায় নিয়মিত যোগ সেশন চালু হয়েছে।
যোগা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত শ্লোক ও তার অর্থ:
_যোগ ভারতীয় দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ। প্রাচীন ঋষিরা বিভিন্ন গ্রন্থে যোগের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। কয়েকটি বিখ্যাত শ্লোক নিচে দেওয়া হল:
১. _পতঞ্জলি যোগসূত্রযোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ।।অর্থ: চিত্তের বৃত্তিসমূহকে নিরোধ করাই যোগ। অর্থাৎ মনের চঞ্চলতা, চিন্তা ও কল্পনার তরঙ্গকে সম্পূর্ণ শান্ত করাই যোগের লক্ষ্য।তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপে অবস্থানম্।। অর্থ: তখন দ্রষ্টা অর্থাৎ আত্মা নিজ স্বরূপে অবস্থান করেন। মন শান্ত হলে মানুষ তার প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করে।
২. _ভগবদ্গীতা যোগসূত্র যোগঃ কর্মসু কৌশলম্।।অর্থ: কর্মের কুশলতাই যোগ। আসক্তি ত্যাগ করে দক্ষতার সঙ্গে কর্তব্য করাই প্রকৃত যোগ।সমত্বং যোগ উচ্যতে।। অর্থ: সমভাবকেই যোগ বলা হয়। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয়ে মনকে সমান রাখাই যোগ।
৩. _হঠযোগ প্রদীপিকাহঠেন গম্যতে যোগঃ।।অর্থ: হঠ অর্থাৎ জোরপূর্বক অভ্যাসের মাধ্যমে যোগ লাভ হয়। শরীর ও প্রাণকে নিয়ন্ত্রণ করে মনকে বশে আনাই হঠযোগ।_শরীরমাদ্যং খলু ধর্মসাধনম্।। অর্থ: শরীরই হল ধর্ম সাধনের প্রথম উপকরণ। যোগের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখা তাই সর্বপ্রথম কর্তব্য।
৪. _উপনিষদ যোগসূত্র _যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু। যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা।।__ অর্থ: যিনি পরিমিত আহার-বিহার করেন, কর্মে পরিমিত চেষ্টা করেন এবং নিদ্রা-জাগরণ যাঁর পরিমিত, তাঁর যোগ দুঃখ বিনাশকারী হয়।
৫. _যোগের সংজ্ঞামনঃ প্রশমনোপায়ো যোগ ইত্যভিধীয়তে।। অর্থ: মনকে প্রশমিত করার উপায়কেই যোগ বলা হয়।_এই শ্লোকগুলি প্রমাণ করে যে যোগ শুধু আসন-প্রাণায়াম নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। চিত্তশুদ্ধি, সমভাব ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে মোক্ষলাভই যোগের চরম লক্ষ্য।
শেষকথা: —-_যোগা শুধু ব্যায়াম নয়, এটি জীবনশৈলী। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর চেতনায় যোগ বিশ্বকে একসূত্রে বাঁধছে। প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে শরীর-মন সুস্থ রাখতে এবং সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে আসুন, প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট যোগাভ্যাস করি। ‘এক বিশ্ব, এক স্বাস্থ্য’—এই লক্ষ্যে যোগই হোক আমাদের সেতুবন্ধ।