জামাইষষ্ঠী উদযাপনের পেছনে এই বঙ্গ সমাজে একটি চমৎকার লোক গল্প প্রচলিত আছে : আছে সমাজের সাধারণ ঘটনার অসাধারণ লাবণ্য!
‘জামাই আইলা জামাই আইলা সাত রাজার ধন রে
পা ধুইবার জল লিআইস বসবার পিঁড়া দও রে।
শঁখ বাজাও আর উলু দও দই চন্দন আন ঘুঁটিয়া
আউ বাবাজিকু বরণ কর নূতন কাপড় দিয়া।’
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর এলাকায় জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে এই জনপ্রিয় লোকছড়া জামাই বরণের বর্ণাঢ্য আয়োজনের একটি অসাধারণ চিত্র তুলে ধরেছে।
বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে জামাইষষ্ঠী কিন্তু অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি লৌকিক উৎসব হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে জামাইষষ্ঠী উদযাপিত হয়। মূলত জামাইকে আদর-আপ্যায়ন করার দিন হিসেবে এটি পরিচিত হলেও, এর উৎপত্তির পেছনে রয়েছে সুগভীর ধর্মীয়, পৌরাণিক এবং সামাজিক ইতিহাস। এরই আবহে জামাইষষ্ঠীর সুপ্রাচীন ইতিহাস ও সমাজবিবর্তনের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরবার চেষ্টা করলাম । এর বাইরে আরও তথ্য আপনাদের জানা থাকলে, তা কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানাবেন।
.জামাইষষ্ঠীর আদি রূপ:—জামাইষষ্ঠীর আদি রূপ হলো ‘অরণ্যষষ্ঠী’। সনাতন ধর্মে দেবী ষষ্ঠী হলেন মাতৃত্ব, প্রজনন এবং সন্তানের রক্ষাকর্ত্রী লৌকিক দেবী। গ্রামীণ সমাজে আগেকার দিনে সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় অরণ্যে বা বনের মধ্যে এই পুজো হতো, তাই এর নাম অরণ্যষষ্ঠী। কালক্রমে এই পারিবারিক ব্রতটির সঙ্গেই জামাই-বরণের লৌকিক প্রথা যুক্ত হয়ে ‘জামাইষষ্ঠী’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
.পৌরাণিক ও লৌকিক গাথা:—জামাইষষ্ঠী উদযাপনের পেছনে এই বঙ্গ সমাজে একটি চমৎকার লোক গল্প প্রচলিত আছে , আছে সমাজের সাধারণ ঘটনার অসাধারণ লাবণ্য! এক গৃহস্থ বাড়ির এক লোভী বউ ছিল। সে ছিল বাড়ির ছোট বউ। সে বাড়ির ভালো ভালো খাবার ও মাছ লুকিয়ে লুকিয়ে নিজে খেয়ে নিত কিন্তু দোষ চাপাত দেবী ষষ্ঠীর বাহন অবলা বিড়ালের ওপর।
এইভাবে নিজের বাহনের ওপর অন্যায় অপবাদ দেখে দেবী ষষ্ঠী ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি কুদৃষ্টি দিলেন ওই বধূর ওপর। এরফলে ওই মহিলার প্রতিটি সন্তান জন্মের পরপরই মারা যেতে থাকে কিংবা হারিয়ে যায়। যারা হারিয়ে যায় তারা আর ফিরেও আসেনা।
একদিন ওই বধূ নিজের ভুল বুঝতে পারলো। তারপর এক গভীর জঙ্গলে গিয়ে দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা করে দেবীর কাছে ক্ষমা চাইলো। দেবী তখন দয়া পরবশ হয়ে তার মৃত ও হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের ফিরিয়ে দিলেন।
এই খাবার চুরির অপবাদের কারণে মেয়েটির শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন মেয়েকে না দেখে ব্যাকুল মা-বাবা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে মেয়ে ও জামাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। জামাই আসার কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠানোর অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। সেই দিনটি থেকেই মেয়ে-জামাইকে ঘরে এনে আপ্যায়নের মাধ্যমে ‘জামাইষষ্ঠী’ উৎসবের সূচনা হয়।
তবে প্রাচীনকালে জামাইষষ্ঠী প্রথার প্রসারের পেছনে কিছু সামাজিক নিয়ম ও বিশ্বাস কাজ করত:
১). মেয়ের মুখ দেখার কৌশল: অতীতে এক প্রাচীন প্রথা ছিল যে, যতদিন না বিবাহিত কন্যা কোনো সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, ততদিন তার বাবা-মা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেন না বা জলগ্রহণ করতেন না। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক সময় সন্তান ধারণে দেরি হতো, ফলে বছরের পর বছর মা-বাবা মেয়ের দেখা পেতেন না। তাই জামাইকে আদর-আপ্যায়নের অজুহাতে মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসে দেখার একটি সামাজিক কৌশল ছিল এই উৎসব।
২). জামাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা: মধ্যযুগীয় বা কলকাতার বাবু সংস্কৃতির যুগে বাল্যবিবাহ এবং সতীদাহ প্রথার মতো কুপ্রথা প্রচলিত ছিল। জামাইয়ের কোনো ক্ষতি হলে মেয়ের জীবনও বিপন্ন হতো। তাই শাশুড়িরা জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি কামনায় মা ষষ্ঠীর পুজো করে জামাইয়ের হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দিতেন।
তবে সময়ের সাথে সাথে পুরোনো কঠোর সামাজিক নিয়ম ও কুসংস্কারগুলো হারিয়ে গেছে। আধুনিক যুগে জামাইষষ্ঠী প্রধানত একটি পারিবারিক মিলনমেলা এবং বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব। এই দিনে শাশুড়িরা মা ষষ্ঠীর পুজো দিয়ে জামাইয়ের কপালে দই-হলুদের ফোঁটা দেন, তালের পাখা দিয়ে হাওয়া করেন এবং জামাইয়ের মঙ্গল কামনা করেন। এরপর ইলিশ, চিংড়ি, পাঁঠার মাংস এবং হরেক রকমের মিষ্টি ও আম-লিচু সহযোগে জামাইকে রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজনে আপ্যায়ন করা হয়।