নির্বাচন কমিশনের নথি ঘেঁটে NCPI সম্পর্কে যে তথ্য উঠে আসছে:
১) .জন্ম ও স্বীকৃতি: ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি NCPI নথিভুক্ত হয় *Registered Unrecognised Political Party (RUPP)* হিসেবে। অর্থাৎ জাতীয় বা রাজ্য দলের মর্যাদা নেই, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের খাতায় নথিভুক্ত দল।
২) .প্রথম নির্বাচন: ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা ভোটে NCPI প্রথম লড়ে। ৭টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা থাকলেও ৪টি আসনে মনোনয়ন বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২টি আসন বরদোয়ালি ও আগরতলা থেকে লড়ে দল। দুটিতেই প্রার্থীদের জামানত জব্দ হয়। মোট প্রাপ্ত ভোট ৬৭৮। দলের মোট অনুদান ছিল ১.১৩ লক্ষ টাকা।
৩).সংগঠন: দলের সর্বভারতীয় সভাপতি উত্তীয় কুণ্ডু। কোষাধ্যক্ষ তাঁর স্ত্রী শিউলি কুণ্ডু। উত্তীয় কুণ্ডু পেশায় ব্যবসায়ী। গত এক বছরে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও তৃণমূল বিরোধী একাধিক পোস্ট করে আলোচনায় আসেন তিনি।
৪). পশ্চিমবঙ্গের ঠিকানা: NDTV-র রিপোর্ট অনুযায়ী, দলের মূল নিবন্ধিত ঠিকানা হাওড়ার বানীপুর। পাশাপাশি, হাওড়ার সাঁকরাইল থানার অন্তর্গত মানিকপুর এলাকায় ‘জাগো বিশ্ব’ নামে এক NGO-র অফিস থেকেই চলে NCPI-র রেজিস্টার্ড অফিস।
৫). লোকসভার অঙ্ক: ২০২৪ লোকসভা ভোটে তৃণমূল ২৯টি আসন পেয়েছিল। ২০ জন সাংসদ বেরিয়ে যাওয়ায় দলের শক্তি কমে দাঁড়াল ৯। NCPI-র হাতে এখন ২০ জন সাংসদ। RUPP দল হলেও লোকসভায় NCPI এখন চতুর্থ বৃহত্তম দল।
৬). আইনি মারপ্যাঁচ: দলত্যাগ বিরোধী আইনের ৪ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ যদি অন্য দলে মিশে যান, তবে তা দলত্যাগ নয়, মার্জার। তৃণমূলের ২৯ জনের মধ্যে ২০ জন অর্থাৎ ৬৮.৯% সাংসদ NCPI-তে যাওয়ায় স্পিকার এই মার্জারকে বৈধতা দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সাংসদ পদ খারিজ হবে না।
৭). NDA-র লাভ: বর্তমান লোকসভায় NDA-র শক্তি ২৯৩। NCPI-র ২০ সাংসদ যোগ দেওয়ায় NDA-র শক্তি বেড়ে হল ৩১৩। ৩২৫-এর ম্যাজিক ফিগারের আরও কাছে পৌঁছে গেল শাসক জোট।
৮). ত্রিপুরা থেকে দিল্লি: যে দল ত্রিপুরায় ৭০০ ভোটও পায়নি, সেই দলই এখন দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির ‘ব্যাকডোর’ স্ট্র্যাটেজির অংশ এই NCPI। তৃণমূল ভাঙতে ছোট দলকে ব্যবহার করা হল।
এখন প্রশ্ন:– তৃণমূল নীরব কেন? কেন মমতা, অভিষেকের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি?
এখনও পর্যন্ত তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। দলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন শুধু বলেন, “যারা গেছে তারা মীরজাফর। মানুষ জবাব দেবে।”
কংগ্রেস-সিপিএম অবশ্য কটাক্ষ করতে ছাড়েনি । প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বলেন, “টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।” সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বলেন, “তৃণমূল আর বিজেপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আজ প্রমাণ হল।”
আগামী দিনে কী হতে পারে?
১). স্পিকার ওম বিড়লা যদি মার্জার মেনে নেন, তাহলে ২০ জনই NCPI সাংসদ হিসেবে গণ্য হবেন। তৃণমূল আদালতে যেতে পারে।
২). যদি স্পিকার দলত্যাগ বলে ঘোষণা করেন, তাহলে ২০টি আসনে উপনির্বাচন হবে। সেক্ষেত্রে রাজ্যের রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হবে।
রবিবারের এই ‘অপারেশন লোটাস’ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে নতুন খাতে বইয়ে দিল। ত্রিপুরার ব্যর্থ দল NCPI এখন দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক পাটিগণিত বাংলার ভোটবাক্সে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার।